রংপুর শহরের ভুয়ারঘাট এলাকার গৃহবধূ লাবণী হঠাৎ কেন প্রতিবাদী হয়ে পুলিশের দ্বারস্থ হলেন! কারণ তার সদ্যপ্রসূত শিশুসন্তানটিকে বিক্রি করে দেওয়া হয়। অপরাধ ছিল ক্লিনিকের বিল পরিশোধে ব্যর্থ হওয়া। একজন মা দীর্ঘ ১০ মাস গর্ভে ধারণ করে সন্তানটিকে আলোর মুখ দেখান। সেই মা ধনী হোন বা দরিদ্র, স্বপ্ন একটাই- মাতৃত্ব পুরোদমে উপভোগ। কিন্তু অনেকের ভাগ্যে তা জোটে না। একসময় স্বাভাবিক ডেলিভারি ঘরে ঘরেই ছিল। প্রসূতিবিদ্যায় অনেকেই পারদর্শী ছিলেন না। আজ যুগ পাল্টেছে। ডাক্তারদের অনেকেই স্বাভাবিক প্রসবে উদ্বুদ্ধ করেন না প্রসূতিদের। আগের থেকেই নানা ভয় প্রসূতির ভেতরে ঢুকিয়ে দেন তারা। এরপর আছে একশ্রেণির দালাল চক্র। এরা এসব প্রসূতিকে আগে থেকেই ক্লিনিকে ভর্তির জন্য নানান রকম প্রলোভন দিতে থাকে, যা নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত যেই হোন না কেন, সঠিক জায়গায় সময়মতো না গেলে ভোগান্তির শেষ থাকে না। রংপুর শহরে ১৩ জানুয়ারি বাস টার্মিনালসংলগ্ন হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ঘটে এমনই এক হৃদয়বিদারক ঘটনা। কত ঘটনাই এরূপ চোখের আড়ালে ঘটে তার খবর কয়জন রাখে।
সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে লাবণী একটি ছেলেসন্তানের জন্ম দেন। কিন্তু ক্লিনিক থেকে ছাড়পত্র নেওয়ার সময় বাধে বিপত্তি। বিল পরিশোধে ব্যর্থ হন লাবণী ও তার স্বামী ওয়াসিম আকরাম। তারা অনেক অনুনয়-বিনয় করলেও ডাক্তারদের মন গলাতে পারেননি। ক্লিনিকের পরিচালককে তারা বিলের টাকা পরে দেওয়ার কথা বললেও কাজ হয়নি। উল্টো নবজাতককে বিক্রি করে ক্লিনিকের বিল পরিশোধের পাশাপাশি আরও টাকা দেওয়ার লোভ দেখানো হয় সেই দম্পতিকে। নবজাতককে মাত্র ৪০ হাজার টাকায় বিক্রির অভিযোগ উঠেছে হাসপাতালের পরিচালক ডা. এস এম রনিসহ তিনজনের বিরুদ্ধে। তাদের গ্রেপ্তার করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় ওই নবজাতককেও উদ্ধার করা হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা হলেন হাসপাতালের পরিচালক ডা. এস এম রনি, নবজাতকের ক্রেতা রুবেল হোসেন এবং তার স্ত্রী বীথি। গত শনিবার এ বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশ জানায়, লাবণী আক্তার নামে এক নারী গত ১৩ জানুয়ারি প্রসববেদনা নিয়ে হলি ক্রিসেন্ট হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই দিন রাতে তার সিজার হয়। ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত সেখানে তারা ছিলেন। হাসপাতালে বিল আসে ৪০ হাজার টাকা। কিন্তু সেই টাকা পরিশোধ করার সামর্থ্য তাদের ছিল না। দূরসম্পর্কের পরিচয়ে লাবণী হাসপাতালের পরিচালক পল্লি চিকিৎসক এস এম রনির কাছে যান এবং তারই পরামর্শে সিজারের মাধ্যমে তার সন্তানের জন্ম হয়। এরপর এই চিকিৎসক লাবণীকে বিল পরিশোধ করতে চাপ দেন। কিন্তু লাবণী এতে অপারগ হওয়ায় তার স্বামী ওয়াসিমের যোগসাজশে রুবেল হোসেন রতন নামে একজনের কাছে ডা. রনি ৪০ হাজার টাকায় বাচ্চাটিকে বিক্রি করে দেন। অভিযোগ পাওয়ার পর রাত ৩টার দিকে নগরীর পীরজাবাদ এলাকা থেকে বাচ্চাটিকে উদ্ধার করা হয়।
লাবণী জানান, তিনি বাচ্চাটিকে দিতে চাননি। তিন-চার দিন ক্লিনিকে থাকার পর তারা জোর করে বাচ্চাটিকে নিয়ে যায়। তার স্বামীর আইডি কার্ডও নিয়েছে তারা। এমনকি তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতও করে।
উপপুলিশ কমিশনার (অপরাধ) আবু মারুফ হোসেন বলেন, ‘এ ঘটনায় মানব পাচার আইনে মামলা হবে। লাবণীর স্বামী পলাতক রয়েছেন। আমরা তাকেও খুঁজছি। তাকেও আমরা আইনের আওতায় আনব।’
বিল পরিশোধে ব্যর্থতার অজুহাত ও পরিবারটির অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে যারা এ ধরনের অপরাধ করেছে তাদের শাস্তি নিশ্চিত হোক- সেটাই প্রত্যাশা। অনেক সময় দেখা যায়, অপরাধীরা ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে আর্থিক লেনদেন করে ঘটনার দফারফা করেন। ফলে অপরাধীরা মুক্ত হয়ে যায়। এ ধরনের প্রবণতা রোধ করতে হবে।