কাপড় বা পোশাক ছাড়া সভ্যতা বেমানান। এ দেশের তাঁতি আর হস্তশিল্পীদের হাতে যে জাদু আছে, সেটাকে ফ্যাশন ডিজাইনের সঙ্গে যুক্ত করলে বিশ্ববাজার দখল করা খুব একটা কঠিন কাজ হবে না। ইংরেজরা এ দেশের তাঁতিদের বিরুদ্ধে বৈষম্যমূলক নীতি অনুসরণই নয়, রীতিমতো অত্যাচারের পথ বেছে নিয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে দলে দলে অনাহারে প্রাণ দিয়েছেন তাঁতিরা। এ কথা স্মরণে রেখেই মহাত্মা গান্ধী চরকাকে তার জীবনসঙ্গী করেছিলেন। তাঁতি ও তাঁতশিল্পকে ভালোবেসে বিবি রাসেল বলেছিলেন, ‘আমি মরে গেলে যেন তাঁতিপাড়ায় আমাকে মাটি দেওয়া হয়।’
সময় এসেছে আমাদের ঐতিহ্য ‘তাঁতশিল্প’ টিকিয়ে রাখার। মোগল শাসনামল ছিল তাঁতশিল্পের স্বর্ণযুগ। বাংলাদেশ ভূখণ্ড মোগল সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হলে মোগল শাসকদের পৃষ্ঠপোষকতার সূত্র ধরে এ দেশের তাঁতশিল্পের সুদিন চরমে পৌঁছেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালের ১১ নভেম্বর প্রীতিরানী দাশকে লেখা এক চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন, তাঁতশিল্পের নিদর্শনস্বরূপ আপনার দেওয়া উপহার জেনারেল ওসমানী সাহেবের মারফতে পেয়ে খুবই খুশি হয়েছি। বঙ্গবন্ধু তাঁতশিল্পের ঐতিহ্যকে এক গৌরবের ভূমিকায় নিয়েছিলেন, যা তার চিঠির ভাষ্যতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বাউলসম্রাট ফকির লালন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও ভেবেছিলেন এ শিল্পের ঐতিহ্য নিয়ে। গৌরবকে আঁকড়ে রাখার হীনম্মন্যতা বাঙালির অস্থিমজ্জা থেকে বিলুপ্তি হওয়ার পথ সুগম করছে প্রতিনিয়ত।
জামদানি, মসলিন, টাঙ্গাইল শাড়ি আর কত না ঐতিহ্য টিকে থাকার লড়াইয়ে ব্যস্ত। নিত্য ক্ষয় হচ্ছে এসব শিল্পের। কিন্তু আজ কেন সুন্দর সাজানো আমাদের টাঙ্গাইলের তাঁতঘর অন্যের দখলে যাবে। এটারও একটা মন্দ ইতিহাস রয়েছে। এ দেশের মূল টাঙ্গাইলের তাঁতিদের ওপর আঘাত আসতে থাকে প্রতিনিয়ত। পঞ্চাশের দুর্ভিক্ষ তাঁতিদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছিল। এরপর আসে আশির দশক। এ সময়টায়ও তাদের ক্ষত বাড়তে থাকে।
গত কয়েক দশকে হাজার হাজার তাঁত ইউনিট বন্ধ হয়ে যায় টাঙ্গাইলে। কয়েকজন তাঁতি আক্ষেপের সুরেই বললেন খবরের কাগজকে। একদিকে করোনা মহামারির ধাক্কা, অন্যদিকে তাঁতশিল্পের নানাবিধ সমস্যাকবলিত হয়ে পড়ায় এ সম্প্রদায়ের মানুষ এ পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় ঝুঁকছেন। কাঁচামালের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাওয়ায় সার্বিকভাবে ঋণ না পাওয়া, সরকারের সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আশির দশকে রাষ্ট্রপতি সাত্তারের আমলে তাঁতিদের পরিবারে পোশাক থাকলেও দুবেলা ভাত জোটেনি। এ সময়টায় কিন্তু পরিবর্তন ঘটে যায় এ দেশে। কিছু তাঁতি নিরুপায় হয়ে ভারতে চলে যান। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এসব তাঁতিকে সুতা, ঋণসুবিধা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিতে থাকে। তারা তাদের শাড়ির নাম দেয় টাঙ্গাইল শাড়ি এবং সরকারের বিভিন্ন সংস্থা সেসব শাড়ি লুফে নেয়।
টাঙ্গাইল শাড়ির ঐতিহ্য অন্তত পাঁচ শ বছরের পুরোনো। ঐতিহাসিকভাবে টাঙ্গাইল শাড়ি তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায়ের তাঁতিরা। পরবর্তী সময়ে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত হলো মুসলিমরাও। বর্তমানে টাঙ্গাইলের তাঁতিদের মধ্যে ৬০ শতাংশেরও বেশি হচ্ছে মুসলিম সম্প্রদায়ের। হিন্দু তাঁতিরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে ভারতে অভিবাসী হয়ে ফিরে যান।
টাঙ্গাইল শাড়ি ভারতের জিআই পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ার পর এ দেশের মানুষের বুকে আঘাত লাগাই স্বাভাবিক। কারণ এ পণ্য বাংলাদেশের টাঙ্গাইল জেলার নামে। গত বৃহস্পতিবার বাংলাদেশের বিখ্যাত টাঙ্গাইল শাড়িকে নিজস্ব জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয় ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়। ভারতের সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে বলে, ‘টাঙ্গাইল শাড়ি পশ্চিমবঙ্গ থেকে উদ্ভূত। এটি ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা মাস্টারপিস। এর মিহি গঠন, বৈচিত্র্যময় রং এবং সূক্ষ্ম জামদানি মোটিফের জন্য বিখ্যাত। এটি এ অঞ্চলের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের প্রতীক।’
আমাদের একটিই কথা, টাঙ্গাইল শাড়ি কীভাবে ভারতের হলো? ভারতের মন্ত্রণালয়ের ফেসবুক পোস্টের নিচে প্রতিবাদ লিখেছে ঐতিহ্যপ্রিয় এ দেশের জনগণ। টাঙ্গাইল শাড়ির সঙ্গেই টাঙ্গাইল জেলার মানুষের এক নাড়ির বন্ধন গড়ে উঠেছে। যেটা কোনোভাবেই ভারতের জিআই স্বীকৃতি পণ্য হিসেবে মানতে নারাজ দেশীয় শিল্প ঐতিহ্যের ধারক ও বাহকরা। এটা যৌক্তিক হতে পারে না। ভৌগোলিকভাবে টাঙ্গাইল কোনো সময়েই পশ্চিমবঙ্গের ছিল না। শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ভারত ভিন্ন নামে তাদের শাড়ির জিআই স্বীকৃতি দিতে পারে। কিন্তু টাঙ্গাইল শাড়ির সঙ্গে টাঙ্গাইল না থাকলে সেটি হতো ভারতের জন্য একদমই বেমানান ও অযৌক্তিক।
একটি পণ্য চেনার ক্ষেত্রে জিআই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পণ্যের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। বাংলাদেশ এ পর্যন্ত ২১টি পণ্যে জিআই স্বীকৃতি পেয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব পণ্যের রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। গবেষকরা বলছেন, অতীতে বাংলাদেশ ও ভারত একই ভূখণ্ডে থাকায় এ সমস্যাগুলো তৈরি হচ্ছে। ভৌগোলিকভাবে দীর্ঘদিন একই সঙ্গে অবস্থান করায় দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতির আদান-প্রদান হয়েছে।
এতে কিছু বিষয়ের উৎপত্তি একটু ঘোলাটে পর্যায়ে রয়েছে। জিআই পণ্যের স্বীকৃতির বেলায় এর ব্যতিক্রম হয়নি। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিশেষ করে যেসব পণ্যের সুনাম ও স্বীকৃতি রয়েছে, স্থানীয়ভাবে সেসব পণ্যের জিআই তালিকাভুক্ত করতে সরকারকে উদ্যোগী ভূমিকা পালন করতে হবে। তাহলে এভাবে আমাদের ঐতিহ্যবাহী পণ্য ও শিল্পকে হারাতে হবে না। একটাই দাবি, টাঙ্গাইল শাড়ি জিআই পণ্য হিসেবে বাংলাদেশেরই থাকবে।