দুর্নীতিবাজ হিসেবে জনমনে ধারণা থাকা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এ নিয়ে ইতোমধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তারা মনে করছেন, এতে করে অনেকেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে হয়রানির শিকার বা হেয় হতে পারেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, তাদের প্রশ্ন তোলাটা অযৌক্তিক নয়।
কেউ যদি দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সব সময় ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। কিন্তু সেই ব্যবস্থার বাইরে এ ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে প্রথমেই সরকারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলো কি তাদের দুর্নীতি দমনের সামর্থ্য হারিয়ে ফেলেছে? প্রচলিত আইনেও শুধু ‘ধারণা’র ওপর নির্ভর করে কারও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না।
ধরা যাক, কেউ কিছু চুরি করেছে। এই চুরি নিয়ে ‘ভিকটিম’ বা ভুক্তভোগীকে থানায় অভিযোগ জানাতে হয়। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে ঘটনা সম্পর্কে পুলিশ ‘তদন্ত’ করে। সেই তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে পুলিশ পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করে। আইনে স্পষ্টভাবেই দুটি পক্ষের কথা বলা আছে। একটি ‘ভিকটিম’ বা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ, আরেকটি প্রতিকারের ব্যবস্থা করবে যারা, সেই পক্ষ। অভিযোগ ছাড়া কখনো কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায় না। এবার আসছি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের ধারণাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ প্রসঙ্গে।
কারও কোনো অভিযোগ নয়, ‘ধারণা’র ওপর ভিত্তি করে দুর্নীতি সম্পর্কে তদন্তের কথা বলা হয়েছে উল্লিখিত নির্দেশে। ধারণা ব্যাপারটাই তো ‘অলীক’ একটা ব্যাপার। অর্থাৎ বাস্তবের প্রত্যক্ষ কিছু নয়, লোকমুখে প্রচলিত গালগল্পের ওপর গড়ে ওঠা ধারণার ওপর ভিত্তি করে তদন্ত করা হবে। এতে যার বিরুদ্ধে তদন্ত করা হবে, তিনি যদি সৎ হন, অর্থাৎ কোনো দুর্নীতি করেননি প্রমাণিত হন, তাহলে তিনি তার কর্মক্ষেত্রে বা সামাজিক ক্ষেত্রে হেয় হবেন। তদন্ত চলাকালেই তার দুর্নাম ছড়িয়ে পড়বে। এককথায় তার মানহানি ঘটবে। এই দায় কে বহন করবে?
দ্বিতীয়ত, এটি অনেকটা ‘মব জাস্টিটে’র মতো ‘মব ট্রায়াল’ হয়ে দাঁড়াবে। ‘জনমন’ মানেই কিন্তু মবের মন। মব মনে করল আর আপনি আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করলেন, এটা আইনের শাসন নয়। যেকোনো অপরাধের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ থাকতে হয়। অপরাধের ভিকটিম যিনি, তাকে অভিযোগ করতে হয়, তার পর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। বিচারকরা অভিযোগের সত্যাসত্য বিচার করে দেখেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রে বিচারের আগেই একটা বিচার হয়ে যাবে, সেটা মবের বিচার। কারও অসৎ উদ্দেশ্য থাকলে মব সৃষ্টি করেও হয়রানি করতে পারে।
দুর্নীতির বিষয়টি আসলে দেওয়া-নেওয়ার বিষয়। একজনের কাজটা হওয়া দরকার, আরেকজন কাজটা করে দেয়। এর আগে উভয় পক্ষ লেনদেনের একটা মৌখিক (লিখিতও হতে পারে) চুক্তিতে পৌঁছায়। পুরো বিষয়টি অবৈধ। যিনি দুর্নীতি করছেন তিনি যেমন অপরাধী, তেমনি যিনি দুর্নীতির বিনিময়ে কাজটা করিয়ে নিচ্ছেন তিনিও অপরাধী। কিন্তু জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় যে নির্দেশনা দিয়েছে, তাতে যিনি দুর্নীতির মধ্য দিয়ে কাজটা পেতে চাইছেন, তাকে অপরাধ-প্রক্রিয়া থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে যিনি দুর্নীতিতে সহায়তা করছেন তাকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।
দুর্নীতি হতে না দেওয়াই দুর্নীতি প্রতিরোধের ভালো উপায়। এ জন্য তাকে আইনের আশ্রয় নিতে হবে। সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ দায়ের করতে হবে। এই অভিযোগের ভিত্তিতে আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে। শুধু ‘ধারণা’র ওপর নির্ভর করে কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে হয়রানি করা ঠিক হবে না।
ইতোমধ্যে এই নির্দেশনা নিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কোনো কোনো সরকারি কর্মকর্তা বিরূপ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তারা বলেছেন, সরকারি কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের পদোন্নিত দেওয়ার আগে একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সবকিছু যাচাই-বাছাই করা হয়। ফলে ‘ধারণা’র ওপর নির্ভরশীল তদন্তের বিষয়টি অবান্তর ও মানহানিকর অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এই নির্দেশনা অবিলম্বে প্রত্যাহার করাই হবে যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত। দুর্নীতি প্রতিরোধ বা কমিয়ে (নির্মূল তো করতে পারবেন না) আনতে হলে দুর্নীতি দমনব্যবস্থাকেই শক্তিশালী করতে হবে। স্প্যানিশ গল্পের সেই ডন কিহোতের মতো বাতাসে তলোয়ার চালিয়ে যুদ্ধ করা যায় না, জয়ীও হওয়া যায় না। দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ওপর ভিত্তি করে ব্যবস্থা নেওয়াই হবে প্রকৃত আইনি পদক্ষেপ।