সেই আনন্দ-উৎসব। সেই চিরাচরিত দৃশ্য। ঈদের আগে অসংখ্য মানুষ রাজধানী ঢাকা ছেড়েছেন। ঢাকায় তাদের ফিরে আসাও শুরু হয়েছে। কিন্তু মাঝের কয়েকটা দিন ব্যস্ত রাজধানী যেন স্বস্তির নিশ্বাসই ফেলেছে। এখনো সেই চিরচেনা রূপে ফেরেনি। ফিরতে আরও কয়েক দিন লাগবে। ছুটির দিনগুলো এই মহানগরীতে এভাবেই হয়তো কেটে যাবে।
ঈদে রাজধানীবাসী একধরনের মিশ্র অনুভূতি নিয়ে কাটান। আনন্দ উদযাপনের আবেগ নিয়ে মানুষ গ্রামের বাড়িতে ছুটে যান। কিন্তু তাদের মধ্যে উৎকণ্ঠা থেকেই যায়। যেভাবে ঢাকা ছেড়ে গেছেন, সেভাবে সবকিছু ঠিকঠাক ফিরে পাবেন তো। বিশেষ করে যে ফ্ল্যাট বা বাসাবাড়ি ছেড়ে গেছেন কয়েক দিনের জন্য, সেখান থেকে কোনো কিছু চুরি হয়নি তো! প্রতিবারই এ রকম শঙ্কা নিয়ে মানুষ ঢাকা ছাড়েন। ঢাকায় যারা থাকেন, তারাও ঈদের কটা দিন শান্তিতে কাটাতে পারবেন কি না, তা নিয়ে উৎকণ্ঠিত থাকেন। এবারও রাজধানী ঢাকার মানুষের মনে এই শঙ্কা ছিল।
এই শঙ্কা ও উদ্বেগের কারণও রয়েছে। সামগ্রিকভাবে গত কয়েক মাসে ঢাকার জনজীবন নানা কারণে অস্থির হয়ে ওঠে। ছিনতাই, চুরি, মারামারি, সংঘাত, রাহাজানি, খুন এবং প্রকাশ্যে নারী নির্যাতনের অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য ও ‘মব জাস্টিসে’র মতো ঘটনায় রাজধানীর মানুষের মনে নিরাপত্তাজনিত শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাধারণত ঈদের সময়ে এ ধরনের ঘটনা অনেক বেড়ে যায়। এবারও সেই শঙ্কা নিয়ে মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন বা ঢাকায় থাকছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত ঈদের দুই দিন কেটে যাওয়ার পরও বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। ঢাকার জনজীবন শান্তই আছে।
সবচেয়ে বেশি স্বস্তি দেখা যাচ্ছে জনজীবনে। জনবহুল রাজধানী এখন অনেকটাই ফাঁকা। সড়কগুলোতে যন্ত্রযানের জট নেই, নেই হকারের হাঁকডাক, হর্নের নিরন্তর শব্দ, বাজারে-শপিংমলে ভিড়, ফুটপাতে মানুষের ব্যস্ত চলা। অনেক স্বস্তির দিন এখন। প্রাণচঞ্চল মহানগরীর যা কিছু ভিড়, তা এখন পার্ক, দর্শনীয় স্থান ও রেস্তোরাঁয়। বিনোদনপ্রিয় ঢাকাবাসী ছুটির দিনগুলোকে উপভোগ করছেন। তবে এর চেয়েও বড় স্বস্তি দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেনি।
ঈদের আগে, ঈদের দিন ও ঈদের পরে সাধারণত ছিনতাই ও চুরির মতো অনেক ঘটনা ঘটে। নিজের ফ্ল্যাটে তালা দিয়ে পুরো পরিবার ঈদ করতে গ্রামের বাড়িতে গেছেন, ফিরে এসে দেখেন দরজার তালা ভেঙে বা গ্রিল কেটে চোরের দল মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করে নিয়ে গেছে। এবার এ রকম ঘটনার খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। রাজধানীর মানুষ ছুটির দিনগুলোকে ভালোই উপভোগ করছেন।
ঢাকার অনেক মানুষকে এই সময় আক্ষেপ করতে দেখা যায়, আহা, ঢাকা যদি বছরজুড়ে এমন থাকত। কিন্তু প্রায় আড়াই কোটি মানুষের রাজধানীতে এটা যে সম্ভব নয়, নগর বিশেষজ্ঞদের সেটাই অভিমত। তারা বারবার বলে আসছেন, রাজধানী ঢাকাকে প্রশাসনিকভাবে কয়েকটি শহরে বিকেন্দ্রীকরণ করা হলে ঢাকার ওপর থেকে জনসংখ্যার চাপ কমে যাবে। এখনকার তুলনায় ঢাকা তখন অনেক বেশি বাসযোগ্য হয়ে উঠবে। কিন্তু এ জন্য অনেক বড় ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন। অতীতে এ নিয়ে কিছু হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে বলে মনে হয় না। আমরা এখন এ নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পারি, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাস্তবায়িত হওয়ার তেমন সম্ভাবনা নেই। সেই সম্ভাবনা না থাকুক, আরও যেসব বিকল্প পথ আছে, সেসব পথ অবলম্বন করা হলে ঢাকা তিলোত্তমা না হোক, আরও বাসযোগ্য হয়ে উঠুক, সেটাই প্রত্যাশা।