২০২৪-এর ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক একধরনের টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে একধরনের কালো ছায়া পড়েছে। বিশেষজ্ঞ মহল দুই দেশের এই সম্পর্ককে স্বাভাবিকভাবে নেয়নি। এরই প্রেক্ষাপটে গত শুক্রবার থাইল্যান্ডের ব্যাংককে সাংরিলা হোটেলে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে প্রথমবারের মতো ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বৈঠক হয়। প্রায় ৪০ মিনিটের বৈঠকে দুই নেতা দুই দেশের সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করার পাশাপাশি চ্যালেঞ্জগুলোর বিষয়ে খোলাখুলিভাবে কথা বলেছেন।
অভ্যুত্থানের মুখে ভারতে পালিয়ে যাওয়া শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়টি বৈঠকে তুলেছেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। পাশাপাশি সীমান্ত হত্যা, গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির নবায়ন, তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষরসহ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ নিয়েও আলোচনা করেন তিনি। অন্যদিকে বাংলাদেশে সংখ্যালঘু, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিয়ে ভারত উদ্বেগ জানিয়েছে। সংখ্যালঘু নির্যাতনের তদন্তের দাবি জানিয়েছে ভারত। দিল্লি আশা প্রকাশ করেছে, ভবিষ্যতে ভারত এমন এক গণতান্ত্রিক, স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ দেখতে চায়, যেখানে নির্বাচনের একটি ভূমিকা রয়েছে। তবে বৈঠকে জনগণের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক জোরদার করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন দুই সরকারপ্রধান।
ভূ-রাজনীতি, বিশ্ব পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক আশার আলো তৈরি করবে বলে মনে করেন দেশের রাজনীতিকরা। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের জনগণকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি উল্লেখ করেন, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা উভয় দেশের জনগণের জন্য বাস্তব সুবিধা বয়ে এনেছে।
নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশের সঙ্গে বাস্তবতার নিরিখে একটি ইতিবাচক ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তুলতে ভারতের আকাঙ্ক্ষার ওপর জোর দিয়েছেন। প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস সীমান্ত হত্যা বন্ধে জোর দিয়েছেন। তিনি বলেন, প্রাণহানির সংখ্যা কমাতে একসঙ্গে কাজ করলে কেবল অনেক পরিবারই বড় ধরনের যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবে তা নয় বরং আস্থা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্ক আরও জোরদার করতে সাহায্য করবে। তিনি আরও বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি সব সময় কষ্ট অনুভব করেন। ভারতকে এই ঘটনাগুলো প্রতিরোধের জন্য উপায় খুঁজে বের করার আহ্বান জানান তিনি।
প্রতিবেশী দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠককে ইতিবাচক বলেছেন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের রাজনৈতিক দল বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, ভূ-রাজনীতিতে এবং বর্তমান বিশ্বরাজনীতির যে প্রেক্ষাপট, বাংলাদেশ ও ভারত অঞ্চলের প্রেক্ষাপট সেখানে প্রধান উপদেষ্টা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকটি আশার আলো তৈরি করেছে। বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের মধ্যে একটা তিক্ততা তৈরি হয়েছিল। সেই তিক্ততা আর যেন বেশি সামনে না আসে, অথবা কমে আসে, সেখানে একটা সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। যতটুকু দেখেছি, তাতে মনে হয়েছে দুজনই খুব আন্তরিক।
নিকট প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক থাকলে উভয় দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মনে রাখতে হবে, আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান পাল্টাতে পারব না। প্রতিবেশীর সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই চলতে হবে। কাজেই উভয় দেশের উচিত ছোটখাটো ভুলগুলো শুধরে নিয়ে সম্পর্ককে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া। পারস্পরিক স্বার্থেই দুই দেশের সম্পর্ক জোরদার এখন সময়ের দাবি।