ইউরোপের নেতৃস্থানীয়রা ইউক্রেনের জন্য একটি শান্তি পরিকল্পনার খসড়া তৈরিতে একমত হয়েছেন। মূলত ওই খসড়া তৈরির পর তা তুলে দেওয়া হবে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে। বিষয়টি সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কেইর স্টারমার।
ওয়াশিংটনে দুই দিন আগেই নজিরবিহীন বাদানুবাদে জড়ান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। তার দুই দিন পরেই লন্ডনে এক সম্মেলনে একত্রিত হন ইউরোপের নেতারা।
সম্মেলনে ফ্রান্স, পোল্যান্ড, সুইডেন, তুরস্ক, নরওয়ে, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া, ফিনল্যান্ড, ইতালি, স্পেন ও কানাডা যোগ দিয়েছিল।
ইউরোপের নেতারা সেখানে নিজেদের প্রতিরক্ষা খরচ বৃদ্ধি করা ইস্যুতে একমত হয়েছেন। তারাই যে চাইলে নিজেদের মহাদেশ নিরাপদে রাখতে পারেন, সেটিই ট্রাম্পের কাছে তুলে ধরতে চাইছেন তারা। স্টারমার জানিয়েছেন, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও অন্যান্য দেশ মিলে একটি জোট গড়ে তুলবে। নতুন ওই জোটের নাম হবে ‘কোয়ালিশন অব উইলিং’ এবং এর অধীনেই তারা শান্তি পরিকল্পনা তৈরি করে তা ট্রাম্পের কাছে নিয়ে যাবেন।
স্টারমার বলেন, ‘এটি আলোচনার সময় না। এটি কাজ করার, নেতৃত্ব দেওয়ার সময় এবং নতুন ন্যায্য ও টেকসই শান্তি পরিকল্পনাকে ঘিরে একত্রিত হওয়ার সময়।’ নেতারা এখনো পরিকল্পনার বিস্তারিত দেয়নি।
তবে সম্মেলন শুরু হওয়ার আগে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ সংবাদপত্র লা ফিগারোকে বলেন, তাদের পরিকল্পনায় এক মাসের যুদ্ধবিরতি থাকবে এবং তা আকাশ ও জলপথের আক্রমণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। স্থলভাগের লড়াইয়ের ক্ষেত্রে ওই যুদ্ধবিরতি প্রযোজ্য হবে না। উল্লেখযোগ্য শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হলে ইউরোপীয় সেনাদের সেখানে পাঠানো হবে বলেও উল্লেখ করেন মাখোঁ।
পরবর্তী সময়ে একই বিষয় ফ্রান্সের পররাষ্ট্রমন্ত্রীও জানান। রয়টার্সের প্রতিবেদনের বরাতে জানা যায়, যুক্তরাজ্যের পক্ষ থেকেও একই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। তবে ইউরোপের অন্যান্য দেশও এ বিষয়ে একমত কি না, সে বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।
এদিকে জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনি ইউরোপের স্পষ্ট সমর্থন পেয়েছেন এবং তারা সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। নিজের নৈশকালীন বক্তব্যে জেলেনস্কি বলেন, শান্তির জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলমান থাকবে।
এর আগে জেলেনস্কি সাংবাদিকদের জানান, ইউক্রেন রাশিয়ার কাছে নিজেদের কোনো এলাকা ছেড়ে দেবে না এবং তিনি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে খনিজ চুক্তি করতে আগ্রহী। জেলেনস্কি আরও জানান, তিনি বিশ্বাস করেন যে ট্রাম্পের সঙ্গে শুক্রবারের ওই ঘটনার পরও সম্পর্ক ঠিকঠাক করা সম্ভব। তবে আগামীতে শান্তি আলোচনা রুদ্ধদ্বারে হতে হবে।
মূলত রাশিয়ার সঙ্গে একাই আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। একদিক থেকে দেখলে রাশিয়ার সব ধরনের শর্তই মেনে নেওয়া হচ্ছে। তারা ইউরোপ বা ইউক্রেন কোনো পক্ষকেই আলোচনায় রাখছে না। আলোচনায় পরবর্তী সময়ে তাদের যুক্ত করা নিয়েও মিশ্র বক্তব্য দিচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন। এ রকম পরিস্থিতিতে ইউরোপ উদ্বিগ্ন ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো এমন কোনো চুক্তি সামনে নিয়ে আসবে যেটিতে শেষ পর্যন্ত ইউক্রেনের স্বার্থরক্ষা হবে না। ওভাল অফিসে ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বাদানুবাদের পর শঙ্কা দেখা দিয়েছে যে ইউক্রেনকে আর হয়তো আলোচনার টেবিলে যুক্তই করবে না যুক্তরাষ্ট্র। পাশাপাশি সহায়তা দেওয়া থামিয়ে দিয়ে রাশিয়ার সঙ্গে সম্মত হওয়া শান্তিচুক্তি চাপিয়ে দেওয়া হতে পারে ইউক্রেনের ওপর এমন শঙ্কাও তৈরি হয়েছে। সে ধরনের কিছু যাতে না হয়, সে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ইউরোপের দেশগুলো।
ইউরোপের প্রতিরক্ষা খাতের খরচ বৃদ্ধি প্রসঙ্গে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডের লিয়েন বলেন, ‘দীর্ঘসময় স্বল্প বিনিয়োগের পর এখন প্রতিরক্ষা খাতে লম্বা সময়ের জন্য বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ পাশাপাশি তিনি ইউক্রেনকে শক্তিশালী করে তোলারও আহ্বান জানান, যাতে অন্য কেউ দেশটিতে কখনো আগ্রাসন না চালাতে পারে। সূত্র: রয়টার্স