মস্কোতে ইউক্রেনের ড্রোন হামলার জবাব দিয়েছে রাশিয়া। খারকিভকে লক্ষ্য করে গত সোমবার (৫ মে) রাতে পাল্টা ড্রোন হামলা চালিয়েছে দেশটি। ইউক্রেনের কর্মকর্তারা বলছে, খারকিভে রাশিয়ার ওই হামলায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে।
ইউক্রেন রাশিয়ায় যে হামলা চালিয়েছিল, তাতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সব ড্রোনই ঠেকিয়ে দিতে সক্ষম হয় দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে ড্রোন হামলার জন্য মস্কোর বিমানবন্দর কিছু সময়ের জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়।
ৱইউক্রেনের উত্তরের সুমি অঞ্চলেও হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। সেখানে তিনজন মারা গেছে এবং সাতজন আহত হয়েছে। রাশিয়া বোমা, মর্টার ও রকেট দিয়ে সুমি অঞ্চলের গ্রামগুলোতে হামলা চালায়। কর্মকর্তারা বলেন, হামলার মুখে ভরোঝবা ও বিলোপিলিয়া গ্রাম থেকে অনেককে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সুমি অঞ্চলটির অবস্থান রাশিয়ার কারস্কের কাছেই। কারস্কে গত সোমবার দিনগত রাতে ইউক্রেনের হামলায় তিনজন মারা গেছে বলে জানিয়েছেন রুশ কর্মকর্তারা। ইউক্রেন জানিয়েছে, তাদের বাহিনী এখনো কারস্কে সক্রিয় রয়েছে। প্রায় ৯ মাস আগে আচমকা অভিযান চালিয়ে কারস্কের দখল নিয়েছিল ইউক্রেন। পরে তাদের দখল থেকে কারস্ক পুনরুদ্ধার করে রাশিয়া।
খারকিভ ও সুমি বাদেও ইউক্রেনের দক্ষিণাঞ্চলের শহর ওদেসায় এক ব্যক্তি রাশিয়ার ড্রোন হামলায় নিহত হয়েছেন। সেখানকার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আরও চার ব্যক্তি ওই হামলায় আহত হয়েছেন। বিবিসির খবর বলছে, রাশিয়া এ আক্রমণে শাহেদ ড্রোন ব্যবহার করেছিল।
এদিকে, রাশিয়া দাবি করেছে, টানা দ্বিতীয় রাতের মতো মস্কোকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে ইউক্রেন। শহরটির মেয়র বলেছে, অন্তত ১৯টি ড্রোন ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার সামরিক বাহিনী বলছে, গোটা শহরজুড়ে একশটিরও বেশি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে।
২০২৪ সালে ইউক্রেনে রেকর্ড ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে রাশিয়ার। গত এক বছরে ইউক্রেন যুদ্ধে অন্তত ৪৫ হাজার ২৮৭ জন মারা গেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরু থেকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বিভিন্ন অংশে রাশিয়ার ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল। তবে গত বছর থেকে প্রতি মাস মৃতের সংখ্যা বেড়েছে। ফ্রন্টলাইন যত এগিয়ে আসছে, ক্ষয়ক্ষতি তত বেশি হচ্ছে।
বিবিসির প্রতিবেদনের তথ্যানুসারে, রাশিয়ার ইউক্রেনের এলাকার দখল নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি সেনা হারিয়েছে। তাদের দখলে থাকা প্রতি বর্গকিলোমিটারের জন্য অন্তত ২৭ জন করে সেনা হারাতে হয়েছে তাদের।
বিবিসি, স্বাধীন গণমাধ্যম মিডিয়াজোনা ও একদল স্বেচ্ছাসেবক রাশিয়ার সেনাদের এই হতাহতের তালিকা তৈরি করেছে। এ কাজে রাশিয়ার কবরস্থান থেকে সংগৃহীত তথ্য, সামরিক স্মরণিকা ও শোক সংবাদের মতো বিষয়গুলো আমলে নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ১ লাখ ৬ হাজার ৭৪৫ জন সেনার নাম চিহ্নিত করা সম্ভব হয়, যারা এ যুদ্ধ চলাকালে প্রাণ হারিয়েছেন।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনুমিত সংখ্যা প্রকৃত মৃত্যুর ৪৫ থেকে ৬৫ শতাংশ বেশি হতে পারে । ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে বেশ কয়েকবার যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব উঠেছে। তবে কোনোবারই হামলা থামেনি।
এমন একটি সময়ে রাশিয়া-ইউক্রেনের মধ্যে এ হামলা-পাল্টাহামলার ঘটনা ঘটল, যখন আরেকটি যুদ্ধবিরতি নিয়ে কথা চলছে। ইউক্রেন সে যুদ্ধবিরতিতে রাজি না হলেও, রাশিয়া তিন দিন যুদ্ধবিরতি দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জয়ের ৮০ বছর উদযাপন নিয়ে ব্যস্ত রাশিয়া। দেশটিতে ৯ মে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদেরও আসার কথা রয়েছে। এ কারণে তারা ৮ মে থেকে ১০ মে যুদ্ধবিরতি রাখার কথা জানিয়েছে ইউক্রেনকে। তবে ইউক্রেন চায় অন্তত ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতি, যা পরে স্থায়ী কোনো সমাধানের দিকে নিয়ে যেতে সহায়তা করবে। ফলে এটি এমন একটি যুদ্ধবিরতি হয়ে দাঁড়িয়েছে, যাতে রাশিয়া রাজি, কিন্তু ইউক্রেনের সম্মতি নেই।
তবে সেটি নিয়ে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই মস্কোর। উল্টো রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে, যদি ইউক্রেন ৯ মে মস্কোতে হামলা চালায়, তাহলে ১০ মে কিয়েভের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে না। ইউক্রেন সম্প্রতি ড্রোন হামলা চালালেও তা রাশিয়ার আয়োজন পণ্ড করার জন্য চালানো হয়নি বলেই ধারণা করা হচ্ছে। কারণ দুই দেশই এখনো সাময়িক ওই যুদ্ধবিরতি সীমার বাইরে রয়েছে। রাশিয়ার একতরফাভাবে বেঁধে দেওয়া সময় অনুসারে, ৮ মে থেকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা।
ক্রেমলিনের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, হামলার মুখেও তারা পরিকল্পনা থেকে সরছেন না। ৮ মে থেকেই যুদ্ধবিরতি শুরু হবে। যদি ইউক্রেন সে সময় কোনো হামলা চালায়, তাহলে তাৎক্ষণিকভাবে উপযুক্ত জবাব দেওয়া হবে। সূত্র: বিবিসি