রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দাবি করেছেন, ইউক্রেনকে পূর্ব দনবাসের পুরো এলাকা ছেড়ে দিতে হবে। পাশাপাশি দেশটির ন্যাটোতে যোগ দেওয়ার আকাঙ্ক্ষাও ত্যাগ করতে হবে। শুধু সেগুলো হলেই এ যুদ্ধের অবসান হবে। ক্রেমলিনের শীর্ষ পর্যায়ের তিন সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট গত শুক্রবার (২২ আগস্ট) যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে আলাস্কায় বৈঠক করেন। তাদের মধ্যে চলা তিন ঘণ্টার বৈঠকের প্রায় পুরোটাজুড়েই ছিল ইউক্রেনের পক্ষ থেকে ছাড় কী রকম হতে পারে, সে বিষয়টি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সূত্র এ তথ্য জানায়।
ট্রাম্প মনে করছেন, ইউক্রেন-রাশিয়ার মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে স্পষ্ট হয়ে যাবে। কনজারভেটিভ টক রেডিও অনুষ্ঠান দ্য টড স্টার্নস শোতে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ মন্তব্য করেন। গতকাল শুক্রবার এক প্রতিবেদনে তথ্যটি তুলে ধরে আনাদোলু নিউজ এজেন্সি।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি প্রচেষ্টার পথে নতুন বাধা নিয়ে হাজির হয়েছে রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের অন্যতম এক প্রস্তাবে রাজি নয় মস্কো। ইউক্রেনের সুরক্ষা নিশ্চিতে ইউরোপের সেনাদের দেশটিতে মোতায়েনের যে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছিল, সেটি নিয়ে আপত্তি রয়েছে রুশদের।
শান্তি প্রচেষ্টার মধ্যেও ইউক্রেনে হামলা থেমে নেই। আগস্টে বড় বড় কয়েকটি হামলার শিকার হয়েছে ইউক্রেন। ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ব্যাপক হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। সেগুলোর পর দিয়েই নিজেদের মনোভাব জানাল মস্কো। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভ বলেছেন, সমঝোতা হয়ে যাওয়ার পর ইউক্রেনে সেনা মোতায়েনের যে প্রস্তাব ইউরোপীয়রা দিয়েছে, তা বিদেশি হস্তক্ষেপের শামিল। এটি রাশিয়ার জন্য পুরোপুরিভাবে অগ্রহণযোগ্য।
লাভরভ জানান, ২০২২ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে শুরু হওয়া প্রাথমিক শান্তি আলোচনায় একটি কাঠামোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। সে কাঠামো নিয়ে আবারও আলোচনায় ফেরা উচিত। ওই কাঠামোতে বলা হয়েছিল, ইউরোপীয় মিত্রদের পাশাপাশি মস্কো ও বেইজিং ইউক্রেনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সহায়তা করবে। তবে কিয়েভের কাছে সে প্রস্তাব অগ্রহণযোগ্য।
লাভরভ বলেন, ‘আমরা ২০২২ সালের এপ্রিলে একমত হওয়া নীতি ও সুরক্ষা নিশ্চয়তাকে সমর্থন করি। সেগুলোর বাইরে যা আছে, তা একবারেই নিষ্ফল চেষ্টা।’ ইউরোপের নেতারা যুদ্ধের পর ইউক্রেনের জন্য সম্ভাব্য সুরক্ষা নিশ্চয়তা নিশ্চিত করতে চাইছেন। ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও এস্তোনিয়া যুদ্ধের পর ইউক্রেনে সেনা পাঠানোর বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছে। অন্যান্য আরও অনেক দেশও এতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে পুরো বিষয়টিই এখনো নির্ভর করছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। তবে লাভরভের মন্তব্যগুলো শান্তি আলোচনার সম্ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এরই মধ্যে জানিয়েছেন, রাশিয়ার সঙ্গে ভবিষ্যৎ শান্তিচুক্তির অংশ হিসেবে চীনকে ‘সুরক্ষা নিশ্চয়তাদানকারী’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে দিতে তিনি রাজি নন। বিষয়টি তিনি স্পষ্টভাবে বাতিলও করে দিয়েছেন।
ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের পর কীভাবে দেশটিতে সুরক্ষা বজায় রাখা যায়, তা নিয়ে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় নেতারা আলোচনায় বসেছিলেন। তারই আবহে এল জেলেনস্কি ও লাভরভের মন্তব্যগুলো।
গত বৃহস্পতিবার কিয়েভ পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, ‘চীনকে কেন সুরক্ষাদানকারী হিসেবে ধরছি না? প্রথমত, চীন আমাদের শুরুতে যুদ্ধ থামাতে সহায়তা করেনি। দ্বিতীয়ত, চীন ড্রোন মার্কেট উন্মুক্ত করে দিয়ে রাশিয়াকে সহায়তা করছে।’
বেইজিং অতীতে একাধিকবার ইউক্রেন যুদ্ধের শান্তিপূর্ণ সমাধান চেয়েছে। তবে রাশিয়ার জন্য অর্থনৈতিক সমর্থন দেওয়াও থামায়নি তারা। চীনকে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বেশ কিছু সংঘাত নিরসনে ভূমিকা রাখতে দেখা গেছে। তবে ইউক্রেন যুদ্ধ প্রশ্নে রাশিয়ার সঙ্গেই সখ্য বজায় রেখেছে দেশটি। আর এখন ইউক্রেন নেতার মন্তব্যের মধ্য দিয়ে এটুকু স্পষ্ট যে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের শান্তি-প্রক্রিয়ায় চীনকে কোনো ভূমিকায় দেখা যাবে না।
জেলেনস্কি বলেছেন, যুদ্ধ অবসানের পর রাশিয়া যাতে ইউক্রেনে কোনো হামলা না চালায়, সে বিষয়টি আন্তর্জাতিক সুরক্ষাদাতাদের নিশ্চিত করতে হবে। আর এ তালিকায় শুধু ওই দেশগুলো থাকতে পারে, যারা ২০২২ সালে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে কিয়েভকে সহায়তা করে এসেছে।
চীন রাশিয়াকে অস্ত্র সরবরাহ করছে বলে গত এপ্রিলে অভিযোগ তুলেছেন জেলেনস্কি। সেবারই প্রথম ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট এ রকম কোনো অভিযোগ তুলেছিলেন। এর আগে অস্ত্র সরবরাহ নিয়ে সরাসরি ইউক্রেনের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয়নি। সূত্র: আল-জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, রয়টার্স, আনাদোলু