মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, তিনি ইউক্রেনে দীর্ঘপাল্লার টমাহক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পাঠানোর বিষয়টি বিবেচনা করছেন। এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হলে রাশিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ভয়াবহভাবে অবনতি ঘটবে বলে সতর্ক করেছে ক্রেমলিন।
গতকাল রবিবার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, “দেখা যাক... হয়তো পাঠাব।” তিনি আরও বলেন, টমাহক সরবরাহ করা ইউক্রেন যুদ্ধে “নতুন এক ধাপের আগ্রাসন” হবে।
সম্প্রতি ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে একাধিকবার ফোনে কথা বলেছেন। আলোচনায় ইউক্রেনের বিমান প্রতিরক্ষা ও দীর্ঘপাল্লার অস্ত্র ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়ানো নিয়ে কথা হয়। জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রকে অনুরোধ করেছেন, কিয়েভ যেন রাশিয়ার আক্রমণ মোকাবিলায় শক্তিশালী অস্ত্র ব্যবস্থা পায়।
টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ২,৫০০ কিলোমিটার (১,৫৫০ মাইল)। ফলে এগুলো ইউক্রেনের হাতে গেলে রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ শহরগুলো, এমনকি মস্কো পর্যন্ত আঘাত হানতে সক্ষম হবে।
ট্রাম্প বলেন, তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে সতর্ক করতে পারেন—যদি যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হয়, তাহলে ইউক্রেনকে টমাহক সরবরাহের সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারেন। “তারা (রাশিয়া) কী চায় টমাহক তাদের দিকে উড়ে যাক? আমার মনে হয় না,” বলেন ট্রাম্প।
রবিবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ বলেন, টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়টি রাশিয়ার জন্য “চরম উদ্বেগজনক”। তার ভাষায়, “এখন সত্যিই এক নাটকীয় সময়—সব দিক থেকেই উত্তেজনা বাড়ছে।” তিনি আরও বলেন, একবার টমাহক ছোড়া হলে এটি পারমাণবিক ওয়ারহেড বহন করছে, নাকি প্রচলিত বিস্ফোরক, তা শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
সাবেক রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভও ট্রাম্পকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেনকে টমাহক দেয়, তবে “এর পরিণাম সবার জন্যই ভয়াবহ হবে—বিশেষ করে ট্রাম্পের জন্য।”
টেলিগ্রামে পোস্টে মেদভেদেভ লেখেন, “রাশিয়া কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে? একদম ঠিক প্রশ্ন!”—যা অনেকের মতে পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
তিনি আরও বলেন, “আশা করা যায়, এটি ট্রাম্পের আরেকটি ফাঁকা হুমকি মাত্র… যেমনটা হয়েছিল পারমাণবিক সাবমেরিন রাশিয়ার কাছাকাছি পাঠানোর কথায়।” গত আগস্টে মেদভেদেভের এক মন্তব্যের জবাবে ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, তিনি দুইটি পারমাণবিক সাবমেরিন রাশিয়ার কাছাকাছি সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।
রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন এর আগেই সতর্ক করেছেন, ইউক্রেনকে টমাহক সরবরাহ করা হলে “মার্কিন-রুশ সম্পর্ক সম্পূর্ণ ধ্বংস হবে।”
অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র পেলে সেগুলো কেবল রুশ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যবহার করা হবে, বেসামরিক এলাকায় নয়।
ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের মধ্যে এই সম্ভাব্য অস্ত্র সরবরাহ নতুন উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। মস্কো বলছে, এমন সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, আর ওয়াশিংটন বলছে—যুদ্ধ বন্ধ করতে হলে রাশিয়ারই পদক্ষেপ নিতে হবে।
টমাহক ক্ষেপণাস্ত্রের বৈশিষ্ট্য
টমাহক (Tomahawk) ক্ষেপণাস্ত্র হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি দীর্ঘ পাল্লার, সাবসোনিক (শব্দের চেয়ে কম গতির) একটি ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র। এটি মূলত জাহাজ বা সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য এবং ভূমি-ভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
টমাহকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর নির্ভুলতা এবং স্টেলথ (Stealth) ক্ষমতা। এটি রাডারে সহজে ধরা না পড়ার জন্য খুব কম উচ্চতায় মাটি ঘেঁষে উড়ে যেতে পারে। জিপিএস, টেরেইন কন্টোর ম্যাচিং (TERCOM) এবং ডিজিটাল সিনিয়ার ম্যাচিং (DSMAC) প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি লক্ষ্যবস্তুতে ১০ মিটার পর্যন্ত নির্ভুলতার সঙ্গে আঘাত করতে পারে। এর প্রচলিত ওয়ারহেডের ওজন প্রায় ১,০০০ পাউন্ড (৪৫০ কেজি)। এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু (যেমন কমান্ড সেন্টার, বিমান প্রতিরক্ষা সাইট) ধ্বংসের জন্য অত্যন্ত কার্যকর। পুরোনো মডেলে পারমাণবিক ওয়ারহেড বহনের ক্ষমতাও ছিল, যদিও বর্তমানে প্রচলিত অস্ত্রই ব্যবহৃত হয়।
টমাহকের প্রধান ব্যবহারকারী হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী (US Navy) এবং যুক্তরাজ্যের রয়্যাল নেভি। ১৯৯১ সালে উপসাগরীয় যুদ্ধের (Gulf War) সময় ইরাকে এর প্রথম অপারেশনাল ব্যবহার হয়। এরপর আফগানিস্তান, সিরিয়া, লিবিয়া এবং ইয়েমেনেও (২০২৪ সালে) এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে। এটি আধুনিক সামরিক কৌশল এবং দূরপাল্লার নির্ভুল আক্রমণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। সূত্র: বিবিসি, রয়টার্স
মাহফুজ/