ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি বলেছেন, তার চিফ অব স্টাফ আন্দ্রি ইয়ারমাক দুর্নীতি দমন সংস্থার অভিযানের পর পদত্যাগ করেছেন।
রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৫৪ বছর বয়সী ইয়ারমাক জেলেনস্কির সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা ছিলেন। যদিও তার বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো অভিযোগ নেই, তবু বাড়তে থাকা এক কেলেঙ্কারির কারণে তার ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়।
সম্প্রতি জেলেনস্কি তাকে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার দায়িত্ব দেন, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ শেষ করতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছেন।
প্রেসিডেন্ট ভবনের বাইরে জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক কঠোর ভাষণের মধ্যে জেলেনস্কি সতর্ক করেন, “আমরা সবকিছু হারানোর ঝুঁকিতে আছি: নিজেদের, ইউক্রেনকে, আমাদের ভবিষ্যৎ।”
এই দুর্নীতি কেলেঙ্কারিটি কয়েক সপ্তাহ ধরে ইউক্রেনকে নাড়িয়ে দিয়েছে, জেলেনস্কির নিজের অবস্থানকে দুর্বল করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় দেশের অবস্থানকেও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে।
ইউক্রেন, ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থনে, যুক্তরাষ্ট্রের খসড়া শান্তি পরিকল্পনার শর্তগুলো পরিবর্তনের জন্য চাপ দিচ্ছে। আগের খসড়াটি রাশিয়ার পক্ষে ঝুঁকে আছে বলে মনে করা হয়েছিল।
শুক্রবার সকালে ইউক্রেনের দুই দুর্নীতি দমন সংস্থা ইয়ারমাকের কিয়েভের সরকারি এলাকায় অবস্থিত অ্যাপার্টমেন্টে অভিযান চালায়। ইয়ারমাক সামাজিক মাধ্যমে জানান, “আমার পক্ষ থেকে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করা হচ্ছে।”
ভিডিও বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, “আমি আন্দ্রির প্রতি কৃতজ্ঞ। আলোচনার টেবিলে ইউক্রেনের অবস্থান তিনি সবসময় যেভাবে তুলে ধরেন, সেটি দেশপ্রেমের জায়গা থেকেই।”
জেলেনস্কি আরও বলেন, শনিবার থেকেই তিনি চিফ অব স্টাফের নতুন নিয়োগ নিয়ে পরামর্শ শুরু করবেন। “যখন মনোযোগ পুরোটা কূটনীতি আর যুদ্ধে প্রতিরক্ষার দিকে, তখন ভেতরের শক্তি প্রয়োজন।”
তিনি সতর্ক করেন, “রাশিয়া চায় ইউক্রেন ভুল করুক। আমাদের পক্ষ থেকে কোনো ভুল হবে না। আমাদের কাজ চলছে, লড়াই চলছে। পিছু হটা বা নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করার কোনো সুযোগ নেই।”
ইয়ারমাকের প্রস্থান জেলেনস্কির জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের আর্মি সেক্রেটারি ড্যান ড্রিসকল এই সপ্তাহের শেষ দিকে কিয়েভে পৌঁছাবেন ট্রাম্পের খসড়া শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা আগামী সপ্তাহে মস্কো যাবেন, আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন শুক্রবার জানান, তিনি বুদাপেস্টে ট্রাম্প-পুতিন বৈঠকের হাঙ্গেরির প্রস্তাব সমর্থন করেন।
পুতিন যুদ্ধ শেষ করার জন্য রাশিয়ার সর্বোচ্চ দাবি বজায় রেখে চলেছেন। বৃহস্পতিবার তিনি দাবি করেন, রুশ বাহিনী বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে এগিয়ে আছে এবং লড়াই তখনই থামবে যখন ইউক্রেনের সেনারা পূর্ব দোনবাস অঞ্চল পুরোটা ছাড়বে।
এই অঞ্চলের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর এখনও ইউক্রেনের নিয়ন্ত্রণে।
পুতিন আরও বলেন, “তারা সরে না গেলে, আমরা অস্ত্রের শক্তিতেই সেটা করিয়ে নেব।”
নিজের ফ্ল্যাটে অভিযান হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে ইয়ারমাক দ্য অ্যাটলান্টিক’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেন কোনো ভূখণ্ড ছাড়বে না।
“জেলেনস্কি যতদিন প্রেসিডেন্ট, কেউ আশা করুক না যে আমরা ভূখণ্ড ছেড়ে দেব। তিনি কখনোই এমন কিছুতে সই করবেন না।”
ইয়ারমাক আরও স্বীকার করেন, তার ওপর “ভয়াবহ চাপ” রয়েছে পদত্যাগের জন্য। তিনি বলেন, “বিষয়টি খুব বড়, তাই রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, স্বাধীন তদন্ত হওয়া জরুরি।”
তদন্তকারীরা জ্বালানি খাতে ১০ কোটি ডলার (৭৫ মিলিয়ন পাউন্ড) আত্মসাতের অভিযোগে কয়েকজন উচ্চপদস্থ ব্যক্তিকে যুক্ত করেছেন।
ইউক্রেনের দুর্নীতি দমন ব্যুরো (ন্যাবু) এবং বিশেষ দুর্নীতি দমন প্রসিকিউটরের অফিস (স্যাপ) জানিয়েছে, তারা রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলিতে ঘুষ নেওয়া ও প্রভাব খাটানোর একটি বড় নেটওয়ার্কের সন্ধান পেয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক জ্বালানি কোম্পানি এনরহোঅ্যাটমও।
ট্রাম্পের খসড়া শান্তি পরিকল্পনায় যুক্ত রুশ কর্মকর্তারা এই দুর্নীতির অভিযোগগুলো জোর দিয়ে তুলে ধরছেন, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মিত্রদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইউক্রেন ইইউ’তে যোগদানের প্রার্থী দেশ, আর সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদনে দেশটির দুর্নীতি দমনের প্রতিশ্রুতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছিল।
জেলেনস্কি ইতোমধ্যে দুই মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেছেন এবং কয়েকজন সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রেসিডেন্টের সাবেক ব্যবসায়িক সহযোগী তিমুর মিনদিচ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইয়ারমাকের জনপ্রিয়তা ভয়াবহভাবে কমে গেছে। সব দলের এমপিরা, এমনকি তার দল থেকেও, দীর্ঘদিন ধরে তাঁর পদত্যাগ দাবি করছিলেন। শুরুতে তারা অভিযোগ করতেন, অনির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও ইয়ারমাকের ক্ষমতা খুব বেশি। পরে দুর্নীতি কেলেঙ্কারির চাপ সেই দাবিকে আরও তীব্র করেছে।
সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ মানুষ তার পদত্যাগ চান।
জেলেনস্কি ও তার সাবেক চিফ অব স্টাফ প্রায় ১৪ বছর ধরে বন্ধু। তখন ভবিষ্যতের এই প্রেসিডেন্ট একজন শীর্ষ মিডিয়া নির্বাহী ছিলেন এবং ইয়ারমাক তার আইনজীবী হিসেবে কাজ করতেন। জেলেনস্কি ২০১৯ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার এক বছর পর ইয়ারমাককে চিফ অব স্টাফ করেন।
রাশিয়ার আগ্রাসনের প্রথম রাতেই দুজন একসঙ্গে সহকর্মীদের নিয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনের সামনে দাঁড়িয়ে সাহসী ভিডিও বার্তা দিয়েছিলেন, যেখানে তারা দেশ ছেড়ে না যাওয়ার এবং লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেন। সূত্র: বিবিসি
মাহফুজ/