রাশিয়ার সঙ্গে চলমান যুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক চাহিদা মেটাতে আগামী দুই বছরের জন্য ইউক্রেনকে সুদমুক্ত ঋণ দেওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) নেতারা। ইইউ কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও কস্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
কূটনীতিকদের বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার (১৯ ডিসেম্বর) ভোরে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়—ইউক্রেনের প্রতিরক্ষায় অর্থ জোগাতে হিমায়িত রুশ সম্পদ ব্যবহার না করে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাজার থেকে ঋণ নেওয়া হবে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এই ঋণের জন্য ইইউকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, এটি দেশের আসন্ন বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় সহায়ক হবে এবং কিয়েভের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাকে “বাস্তব অর্থেই শক্তিশালী” করবে।
এক্সে দেওয়া এক বার্তায় জেলেনস্কি বলেন, “এটি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা, যা সত্যিই আমাদের স্থিতিশীলতা বাড়ায়। রুশ সম্পদ হিমায়িত অবস্থায় থাকা এবং আগামী বছরগুলোর জন্য ইউক্রেনের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চয়তা পাওয়া খুবই জরুরি।”
ইইউ কাউন্সিল প্রেসিডেন্ট কস্তা সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে বলেন, “আমাদের একটি চুক্তি হয়েছে। ২০২৬-২৭ সালের জন্য ইউক্রেনকে ৯০ বিলিয়ন ইউরো (১০৫.৫ বিলিয়ন ডলার) সহায়তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত অনুমোদিত। আমরা অঙ্গীকার করেছি, আমরা তা বাস্তবায়ন করেছি।”
তবে কস্তা অর্থের উৎস স্পষ্ট করেননি। বৃহস্পতিবার গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনার পর এই সমঝোতায় পৌঁছান ইইউ নেতারা।
তবে রয়টার্সের দেখা শীর্ষ বৈঠকের চূড়ান্ত ঘোষণার খসড়া অনুযায়ী, এই অর্থ আসবে পুঁজিবাজার থেকে নেওয়া ঋণ থেকে, যা ইইউ বাজেটের গ্যারান্টিতে সুরক্ষিত থাকবে। অর্থাৎ, ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় সহায়তার জন্য হিমায়িত রুশ সম্পদ ব্যবহার করার বিতর্কিত পরিকল্পনা থেকে আপাতত সরে এল ইইউ।
একই সঙ্গে, রুশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্পদের ভিত্তিতে ইউক্রেনের জন্য আলাদা একটি ঋণ কাঠামো গঠনের বিষয়টি নিয়ে ইইউ সরকার ও ইউরোপীয় পার্লামেন্টের আলোচনা চলবে।
শুক্রবারের এই সিদ্ধান্তে হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রের আর্থিক দায় থাকবে না। দেশগুলো ইউক্রেনের অর্থায়নে অংশ নিতে চায়নি বলে খসড়া নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাবিষয়ক বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ বলেন, ইইউ রুশ সম্পদ ব্যবহার না করে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় “আইন ও বিবেকের জয়” হয়েছে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, “ব্যর্থ উরসুলার নেতৃত্বে থাকা ইইউ যুদ্ধবাজদের জন্য এটি বড় ধাক্কা—ইউক্রেনের জন্য অর্থ জোগাতে রুশ রিজার্ভের অবৈধ ব্যবহার ঠেকানো গেছে।” এখানে তিনি ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লেয়েনকে ইঙ্গিত করেন।
খসড়া নথি অনুযায়ী, মস্কোর কাছ থেকে যুদ্ধক্ষতিপূরণ না পাওয়া পর্যন্ত ইউক্রেন এই যৌথ ঋণ পরিশোধ করবে না। ততদিন রুশ সম্পদ হিমায়িত থাকবে। তবে প্রয়োজনে ওই সম্পদ ব্যবহার করে ঋণ পরিশোধের অধিকার ইইউ সংরক্ষণ করে রেখেছে।
একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইইউ কূটনীতিক রয়টার্সকে বলেন, “ভালো দিক হলো—ইউক্রেন দুই বছরের জন্য নিশ্চিত অর্থায়ন পাচ্ছে।”
এর আগে কয়েক ঘণ্টা ধরে নেতারা হিমায়িত রুশ সম্পদের ওপর ভিত্তি করে ঋণের আইনি ও কারিগরি দিক নিয়ে আলোচনা করেন। তবে কূটনীতিকদের মতে, বিষয়টি এই মুহূর্তে খুব জটিল ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে ওঠায় তা চূড়ান্ত করা যায়নি।
আরেক ইইউ কূটনীতিক বলেন, “আমরা ইউক্রেনকে বাঁচানো থেকে এখন মুখরক্ষা করার পর্যায়ে চলে এসেছি—অন্তত তাদের জন্য, যারা শুরু থেকেই হিমায়িত সম্পদ ব্যবহারের পক্ষে ছিল।”
রুশ অর্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যা ছিল বেলজিয়ামকে পর্যাপ্ত আইনি ও আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া। কারণ, মোট হিমায়িত রুশ সম্পদের প্রায় ২১০ বিলিয়ন ইউরোর মধ্যে আনুমানিক ১৮৫ বিলিয়ন ইউরো বেলজিয়ামে রয়েছে। মস্কোর সম্ভাব্য আর্থিক ও আইনি প্রতিশোধের আশঙ্কা ছিল বড় বাধা।
ক্রেমলিন আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল, রুশ সম্পদ ব্যবহার করা হলে তারা আইনি পদক্ষেপ নেবে এবং রাশিয়ায় থাকা বিদেশি সম্পদ জব্দ করবে।
বিভক্ত ইউরোপ
শুক্রবারের সিদ্ধান্তের আগে বিশ্লেষকেরা বলেছিলেন, ইউক্রেনের যুদ্ধ প্রচেষ্টায় অর্থ জোগানোর জন্য হিমায়িত রুশ সম্পদ ব্যবহারই কার্যত একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ। তবে এটি নজিরবিহীন হতো—এমনকি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ও জার্মান রাষ্ট্রীয় সম্পদ জব্দ করা হয়নি।
বৃহস্পতিবারের বৈঠকের আগে জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ সতর্ক করে বলেছিলেন, সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা ছিল “৫০-৫০”।
বেলজিয়ামের প্রধানমন্ত্রী বার্ট ডে ওয়েভার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে বলেন, আইনি ও আর্থিক ঝুঁকি নিয়ে তিনি এখনও গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এর আগে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, আদালত যদি রুশ সম্পদ ব্যবহারের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণা করে, তাহলে বেলজিয়াম রাশিয়াকে ক্ষতিপূরণ দিতে হতে পারে।
বেলজিয়াম দাবি করেছিল, সম্ভাব্য সব দায়ভার বহনের জন্য অন্য ইইউ দেশগুলোর কাছ থেকে বাধ্যতামূলক প্রতিশ্রুতি এবং বেলজিয়ামের বাইরে থাকা রুশ সম্পদ ব্যবহারের নিশ্চয়তা।
জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ ঋণের পক্ষে থাকলেও ইতালি ও বুলগেরিয়ার মতো দেশগুলো দ্বিধায় ছিল।
শেষ পর্যন্ত শুক্রবার ভোরে ডে ওয়েভার পুঁজিবাজার থেকে ঋণ নেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এই পদক্ষেপের মাধ্যমে ইইউ “অরাজকতা ও বিভাজন” এড়াতে পেরেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/