প্রথম নজরে শীতের ইয়েলেতস যেন রুশ রূপকথার কোনো দৃশ্য। নদীর পাড় থেকে চোখে পড়ে অর্থডক্স গির্জার সোনালি গম্বুজ, আর নিচে জমে যাওয়া নদীর বরফের ওপর ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসে আছেন বরফে মাছ ধরা মানুষ। কিন্তু মস্কো থেকে প্রায় ৩৫০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এই শহরে রূপকথার আবহ খুব বেশি সময় স্থায়ী হয় না। নদীর তীরেই চোখে পড়ে সেনাবাহিনীতে নিয়োগের একটি বিলবোর্ড। সেখানে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যে কেউ ইউক্রেনে যুদ্ধে নাম লেখালে এককালীন ১৫ হাজার পাউন্ডের সমপরিমাণ অর্থ পাবে।
কাছেই আরেকটি পোস্টারে এক রুশ সেনাকে কালাশনিকভ তাক করতে দেখা যায়। স্লোগান লেখা, ‘আমরা সেখানেই আছি, যেখানে আমাদের থাকা প্রয়োজন।’
ক্রেমলিন ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু করে। রাশিয়ার বাইরে এটি ব্যাপকভাবে দেখা হয় কিয়েভকে আবার মস্কোর প্রভাব বলয়ে ফেরানো এবং শীতল যুদ্ধপরবর্তী ইউরোপের নিরাপত্তা কাঠামো ভেঙে দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে।
রুশ নেতৃত্ব ভেবেছিল, এটি হবে সংক্ষিপ্ত ও সফল সামরিক অভিযান। কিন্তু পরিকল্পনা অনুযায়ী সব হয়নি। চার বছর পরও ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ চলছে। এতদিনে এর উত্তাপ রাশিয়াও বুঝতে শুরু করেছে।
রুশ কর্তৃপক্ষ তথাকথিত ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’-এর হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করে না। তবে জানা যায়, রাশিয়ার যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত দুই বছরে রাশিয়ার বহু শহর ও গ্রামে ইউক্রেনে নিহত সেনাদের স্মরণে জাদুঘর ও স্মৃতিস্তম্ভ গড়ে উঠেছে। স্থানীয় কবরস্থানেও সাম্প্রতিক যুদ্ধের জন্য আলাদা অংশ রাখা হয়েছে।
সেখানেরই বাসিন্দা ইরিনা বাসস্টেশনে টিকিট সংগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন। সংসার চালাতে তার কষ্ট হয়। তিনি বলেন, ‘ইউটিলিটি বিল আমাদের দম বন্ধ করে দিচ্ছে। দাম বাড়ছে। টিকে থাকা খুব কঠিন।’
অর্থকষ্ট থাকলেও তিনি সামনের সারির রুশ সেনাদের জন্য সহায়তা প্যাকেজ তৈরিতে সাহায্য করেন। ইউক্রেন যুদ্ধের সমালোচনা করেন না, তবে বিভ্রান্তি আছে তার মনে।
ইউক্রেন সীমান্ত ওই স্থান থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে। কিন্তু কখনো কখনো ফ্রন্টলাইন যেন অনেক কাছেই। রাশিয়ার ওই অংশসহ অনেক এলাকা ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয়েছে। ইয়েলেতসের আশপাশে জরুরি আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করেছে কর্তৃপক্ষ। একটি বাসস্টপে, আরেকটি পার্কে সেগুলো চোখে পড়ে।
এই কংক্রিটের কাঠামোগুলো যেন প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’-এর স্মারকচিহ্ন। ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের আগে রাশিয়ায় ড্রোন হামলার আশঙ্কা ছিল না, তাই আশ্রয়কেন্দ্রেরও প্রয়োজন পড়েনি।
ইয়েলেতসের আবাসিক ভবনগুলোর বেজমেন্টেও নির্দিষ্ট আশ্রয়স্থল রয়েছে। ইরিনা বলেন, ‘প্রায় প্রতি রাতেই সাইরেন বাজে। তবে আমি ভবন ছেড়ে যাই না। জানালাবিহীন করিডরে গিয়ে দাঁড়াই।’
অপ্রত্যাশিত জায়গাতেও যুদ্ধের ছাপ রয়েছে। একটি স্থানীয় প্যানকেক ক্যাফের নামের সাইনবোর্ডে লাতিন অক্ষর ভি ও জেড ব্যবহার করা হয়েছে, যা ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’-এর প্রতীক।
যুদ্ধ অর্থনৈতিকভাবে ক্লান্তিকর। রাশিয়ার বাজেট ঘাটতি বাড়ছে, অর্থনীতি স্থবির। সরকার ভ্যাট ২০ শতাংশ থেকে ২২ শতাংশে উন্নীত করেছে। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, অতিরিক্ত রাজস্ব ‘প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা’তে ব্যয় হবে।
রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জনগণকে সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। টিভি উপস্থাপক দিমিত্রি কিসেলেভ দর্শকদের বলেন, ‘আমরা যুদ্ধের সময়ে বাস করছি। এমন একটি যুদ্ধ, যা পশ্চিম আমাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। আমাদের এটি জিততেই হবে, আর যুদ্ধ বাজেট ছাড়া তা সম্ভব নয়।’
রাশিয়ার ছোট ব্যবসাগুলো যুদ্ধের খরচের জেরে চাপে পড়েছে। ইয়েলেতসের একটি বেকারিতে সদ্য তৈরি করা কিশমিশ রুটি, স্কোন আর ক্রিম পেস্ট্রির গন্ধ আকর্ষণ করে। কিন্তু অর্থনৈতিক মন্দা ও কর বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দোকানটিতে।
মালিক আনাস্তাসিয়া বাইকোভা বলেন, ‘আমাদের দাম বাড়াতে হয়েছে। ইউটিলিটি বিল, ভাড়া, কর–সব বেড়েছে। ভ্যাট বাড়ায় উপকরণের দামও বেশি। ভাবুন তো, যদি আমাদের বেকারি আর সামনের রেস্তোরাঁ, সব বন্ধ হয়ে যায়? আমরা শহরটাকে সুন্দর রাখার চেষ্টা করি। কিন্তু আমরা বন্ধ হলে কী থাকবে? শুধু এক টুকরো অন্ধকার ধূসর জায়গা।’ সূত্র: বিবিসি