আজ ২৬ মার্চ। মহান স্বাধীনতা দিবস। ১৯৭১ সালের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অপারেশন সার্চলাইটের বাঙালি নিধনযজ্ঞের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সর্বশক্তি নিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধ করার নির্দেশ দেন তিনি। শুরু হয় স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অর্জনের চূড়ান্ত লড়াই। স্বাধীনতার জন্য আমাদের ৯ মাস সশস্ত্র সংগ্রাম করতে হয়। সেই ইতিহাস যেমন রক্তক্ষয়ী ইতিহাস, তেমনি আত্মগৌরবের ইতিহাস। এর পরই ঐক্যবদ্ধ পুরো জাতি সর্বাত্মক সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
আনুষ্ঠানিক প্রতিরোধ ও মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় শেখ মুজিবের অবর্তমানে সৈয়দ নজরুল ইসলামকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে গঠিত হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার। সাধারণ মানুষ থেকে গৃহবধূ, কিশোর থেকে প্রৌঢ়, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় চঞ্চল সব শ্রেণির মানুষ এই যুদ্ধে নানাভাবে অংশগ্রহণ করে। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্ষক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা। আমরা আজ সেই সব মুক্তিযোদ্ধার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি, যারা মাতৃভূমিকে মুক্ত করার জন্য যুদ্ধ করে শহিদ হয়েছিলেন।
এই স্বাধীনতা এক দিনে আসেনি। এর পটভূমি অনেক দীর্ঘ। ১৯৪৭ সালে ভারতবিভক্তির অব্যবহিত পর পঞ্চাশের ভাষা আন্দোলন, ষাটের স্বাধিকার আন্দোলন, সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন আর গণ-অভ্যুত্থানের পথ পেরিয়ে ১৯৭১ সালে উদিত হয় স্বাধীনতার লাল সূর্য।
স্বাধীনতার প্রথম লক্ষ্য ছিল পাকিস্তানি ঔপনিবেশিক শাসন-শোষণের হাত থেকে মুক্ত হওয়া। লক্ষ্য ছিল একটি উদারনৈতিক ন্যায়ভিত্তিক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সৃষ্টি করা; যে রাষ্ট্রে প্রত্যেক মানুষের সমানাধিকার থাকবে, শোষণের শিকার হবে না কেউ। সবার বেঁচে থাকার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হবে।
আজ জাতি ৫৫তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন করছে। কিন্তু এখনো অনেক লক্ষ্য পূরণ করা যায়নি। যে পাঁচটি মৌলিক অধিকার সর্বজনীন- অন্ন, বস্ত্র, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বাসস্থান সবার জন্য আমরা তা নিশ্চিত করতে পারিনি। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াইটা ছিল শোষণমুক্ত একটা সমাজ প্রতিষ্ঠার লড়াই, যার মধ্য দিয়ে বৈষম্যহীন একটা রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু সে রকম সমাজ এখনো আমাদের অধরা রয়ে গেছে। ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান এত বেশি যে এখনো এক-চতুর্থাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, হতদরিদ্র, অর্থাৎ যারা দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করেন, তাদের সংখ্যা বেড়েছে। বৈষম্যের চেহারা যে কত প্রকট, এ থেকে তা বোঝা যায়। অথচ গত জুলাই-আগস্টে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে দেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল।
এখন আমরা একটা নতুন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। নতুন আশা, নতুন স্বপ্ন। কিন্তু পূরণ হবে কি সেই প্রত্যাশা? কেননা, এখন জুলাই-পরবর্তী সময়ে সমাজে ও রাষ্ট্রে আমরা একধরনের অস্থিরতা দেখতে পাচ্ছি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। রাজনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল। কোথাও কোথাও প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে হানাহানির ঘটনা ঘটছে। সরকারপ্রধান প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, এ বছরের ডিসেম্বরে অথবা আগামী বছরের জুনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আশার কথা এটাই।
সাধারণ মানুষও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা চায় শোষণমুক্ত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সাধারণ মানুষের এই আকাঙ্ক্ষাই বাংলাদেশকে স্বাধীনতার চেতনায় অভীষ্ট লক্ষ্যে নিয়ে যেতে পারে। সাধারণ মানুষই বাংলাদেশের মূল শক্তি। আজ সেই প্রত্যয়ে শপথ নেওয়ার দিন। আসুন, আমরা সেই অঙ্গীকার করি। যা কিছু জীর্ণ, যা কিছু পুরাতন, দূর হয়ে যাক। আমরা সবাই বাংলাদেশকে একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী উদার, অসাম্প্রদায়িক, ন্যায়ভিক্তিক, শোষণমুক্ত রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার শপথ গ্রহণ করি।