বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে উচ্চ মূল্যস্ফীতি স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে। দ্রব্যসামগ্রীর চড়া দামে নাকাল সাধারণ মানুষ। অনেকেই সঞ্চয়পত্র ভেঙে ফেলছেন। কারণ মানুষের আয়ের চেয়ে ব্যয় বেড়েছে। এ অবস্থায় সাধারণ মানুষের পক্ষে নতুন করে সঞ্চয় বা বিনিয়োগ কোনোটাই করা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারভিত্তিক করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। যা গত জানুয়ারি থেকেই কার্যকর করা হয়েছে। এতে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদহার আগের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সুদহার বাড়লেই যে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বাড়বে, এটা ঠিক নয়। সরকার সঞ্চয়পত্রে যে সংস্কার করেছে তা মূলত সুদহার বাজারভিত্তিক করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে। সুদহার বাড়ানোর জন্য নয়। কারণ সঞ্চয়পত্র থেকে বেশি ঋণ না নিতে আইএমএফের পরামর্শ রয়েছে। প্রতিবছর বাজেট ঘাটতি হিসেবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে সরকার যে পরিমাণ ঋণ করে, সঞ্চয়পত্র থেকে তার এক-চতুর্থাংশের বেশি ঋণ নিতে পারবে না। সেই সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের সুদহার বাজারভিত্তিক করতে হবে বলে পরামর্শ আইএমএফের।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ৭ মাসের সঞ্চয়পত্রের নিট বিনিয়োগ হয়েছে ঋণাত্মক ৭ হাজার ১৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ এ সময় গ্রাহকরা নতুন বিনিয়োগ করার চেয়ে নগদায়ন বেশি করেছেন। সঞ্চয়পত্রের এই নিট বিনিয়োগই চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসের সরকারের ‘ঋণ বা ধার’। নিয়ম অনুযায়ী, আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল পরিশোধের পর যা অবশিষ্ট থাকে তাকে বলা হয় নিট বিক্রি। ওই অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা থাকে। সরকার তা বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজে লাগায়। এ কারণে অর্থনীতির ভাষায় সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রিকে সরকারের ‘ঋণ বা ধার’ হিসেবে গণ্য করা হয়।
চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১৫ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। গত অর্থবছর সঞ্চয়পত্র বিক্রি থেকে নিট ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৮ হাজার কোটি টাকা। এর বিপরীতে নিট বিনিয়োগ হয়েছে ঋণাত্মক ২১ হাজার ১২৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ পুরো অর্থবছরে এ খাত থেকে সরকার এক টাকাও ঋণ নেয়নি। এ বিষয়টিকে মাথায় রেখেই ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমানো হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, দেশের অর্থনীতির বর্তমান যে পরিস্থিতি, তাতে বিনিয়োগ, মজুরি এবং শ্রমবাজার কোথাও খুব বেশি সুখবর নেই। শুধু রেমিট্যান্স ও রপ্তানি আয় বাদে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কোনো খাতেই আয় বাড়ছে না। অন্যদিকে স্থিতিশীল রয়েছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি। অর্থাৎ মানুষের আয় না বাড়লেও ব্যয় বাড়ছে। এ অবস্থায় নতুন করে সঞ্চয় করার মতো সক্ষমতা অধিকাংশ মানুষেরই নেই। যে কারণে সুদহার বাড়ানোর পরও সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বাড়ছে না।
উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় আয় বাড়েনি। সংগত কারণেই বিনিয়োগের মতো অর্থ সঞ্চিত থাকছে না। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় সংকোচন করতে পারলে মানুষ বিনিয়োগমুখী হতো। এ ক্ষেত্রে সরকারের দিক থেকে বাজার নিয়ন্ত্রণই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে মানুষ কিছুটা স্বস্তি পাবে এবং কিছু সঞ্চয়ও করতে পারবে। সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ বাড়াতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।