দেশের একটি সম্ভাবনাময় খাত এয়ারলাইন শিল্প। এই শিল্প বিকাশে বেশ কিছু বাধা রয়েছে। যার জন্য এ শিল্প বেশি দূর এগোতে পারছে না। সবচেয়ে বড় বাধা হলো সারচার্জ। বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) লাগামহীন সারচার্জের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের বিমান শিল্প। প্রতিবেশী দেশগুলোয় এই সারচার্জ বছরে সর্বোচ্চ ১২ শতাংশ হলেও আমাদের দেশে এই চার্জ ক্ষেত্রবিশেষে ৭২ শতাংশ। ফলে এয়ারলাইন শিল্পের বিকাশ যথাযথভাবে ত্বরান্বিত হচ্ছে না। বিমান সংস্থাগুলোর অভিযোগ, অযৌক্তিক সারচার্জ এ শিল্পের প্রসারে বড় বাধা। সারচার্জের কারণে বাংলাদেশে বড় কোনো এয়ারলাইন গড়ে উঠতে পারছে না।
বেবিচকের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দরের উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। বিভিন্ন এয়ারলাইনসের অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জই কেবল বেবিচকের আয়ের মূল উৎস। বছর কয়েক আগে যাত্রী নিরাপত্তা ফি ও বিমানবন্দর উন্নয়ন ফি যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা হলেও তা মোট ব্যয়ের তুলনায় নগণ্য। ফলে এসব পাওনা আদায় বেবিচকের আয়ের বড় অংশ।
দেশে কার্যক্রম চালানো দেশি-বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোকে বিমানবন্দরে উড়োজাহাজ রাখার জন্য যেমন পার্কিং চার্জ দিতে হয়, তেমনি বিমানবন্দর ব্যবহারের জন্য বিভিন্ন অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনেটিক্যাল চার্জও দিতে হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বিমানবন্দরের কন্ট্রোল টাওয়ার, নেভিগেশন, নিরাপত্তা, বিমানবন্দর ব্যবহার, বোডিং ড্রেস ইত্যাদি। দেশি উড়োজাহাজ সংস্থাগুলো যেহেতু আন্তর্জাতিক রুটের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ রুটেও ফ্লাইট পরিচালনা করে, তাই এ চার্জ বেশি দিতে হয় তাদের। আর যখন এই চার্জের টাকা বকেয়া পড়ে, তখন এয়ারলাইনসগুলোকে গুনতে হয় সারচার্জ। এক বছর বকেয়া থাকলে সারচার্জে যোগ হয় ৭২ শতাংশ।
বেবিচকের সূত্রমতে, দেশে পরিচালিত সাতটি বিমান সংস্থার মধ্যে ছয়টির কাছে টাকা পাবে বেবিচক। ২০২৪ সালের নভেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি মালিকানাধীন পাঁচটি বিমান সংস্থার কাছে বেবিচকের ১ হাজার ৩৯৪ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এর মধ্যে সারচার্জের পরিমাণ ৯১৪ কোটি টাকা। এ ছাড়া কেবল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কাছেই বেবিচকের পাওনা ৬ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা।
অ্যাভিয়েশন বিশেষজ্ঞ এ টি এম নজরুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, বকেয়া আদায়ের জন্য বেবিচকের আগে থেকেই ব্যবস্থা নেওয়া দরকার ছিল। তাদের গাফিলতির কারণে বকেয়ার পরিমাণ অনেক বেড়ে গেছে। বকেয়ার সঙ্গে ৬ শতাংশ সারচার্জ যুক্ত হয়ে বকেয়ার অঙ্ক বড় হয়েছে। যা এয়ারলাইনসগুলোর পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সেই সময় যদি এই সারচার্জ মওকুফ করে বকেয়া পরিশোধ করার সুযোগ দেওয়া হতো, তাহলে এই এয়ারলাইনসগুলো হয়তো বন্ধ হতো না।
বেসরকারি বিমান সংস্থার কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা অযৌক্তিক সারচার্জ কমানোর দাবি করে আসছেন। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠিও পাঠিয়েছেন। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় তা নাকচ করে দিয়েছে। দেশি এয়ারলাইনসগুলো সব সময়ই তাদের অস্তিত্ব নিয়ে হুমকিতে থাকে। কারণ একবার বকেয়া হয়ে গেলে এয়ারলাইনসগুলো আর ঘুরে দাঁড়াতে পারে না। বন্ধ হওয়া এয়ারলাইনসগুলো পুনরায় চালু করতে না পারার একটি বড় কারণ সারচার্জ।
এদিকে বেবিচকের আয়ের উৎস বিভিন্ন এয়ারলাইনসের অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল চার্জ। তাদের আয়ও ঠিক রাখা প্রয়োজন। তবে অতিরিক্ত সারচার্জ প্রয়োগ করে নয়। সবকিছু মিলিয়ে উভয় পক্ষের মধ্যে আলাপ-আলোচনা দরকার। সারচার্জ ধার্য করার আগে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যাতে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, সেদিকে লক্ষ রাখা উচিত। কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে, যাতে দেশি এয়ারলাইনসগুলো ঘুরে দাঁড়াতে পারে।