কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের অভাবে মানসম্মত চামড়া রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। দেশে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের এখনো তেমন কোনো আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। অথচ তৈরি পোশাকশিল্পের পরই চামড়া খাতটি আমাদের দেশের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর সর্বশেষ তথ্যমতে, সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছে ৪ হাজার ৮২৮ কোটি ডলার। রপ্তানি বেড়েছে এর আগের অর্থবছরের তুলনায় ১০ শতাংশের বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ খাতে রপ্তানি হয়েছিল ৩ হাজার ৯৩৪ কোটি ডলার।
সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা বলছেন, কমপ্লায়েন্স বা যথাযথ মান প্রতিপালন করতে পারলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ রপ্তানি খাত আবার ফিরে পাবে হারানো গৌরব। বাড়বে রপ্তানি, চাঙা হবে দেশের অর্থনীতি। দেশের বেশির ভাগ কারখানার পরিবেশ বিশ্বমানের না হওয়ায় কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। অন্যদিকে চামড়া ব্যবসায়ীরাও আর্থিক সংকটে ভুগছেন। সরকারের দেওয়া ঋণের পরিমাণও কমছে। এদিক থেকে চীনের চামড়া খাত অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে। ফলে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন বাংলাদেশের চামড়া ব্যবসায়ীরা।
শিল্প খাতের সংশ্লিষ্টরা চলমান সংকট কাটিয়ে উঠতে সরকারকে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ জানিয়ে বলেছেন, গত ২০ বছরেও সাভার শিল্পনগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার নির্মাণের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি। ফলে অনেক কারখানায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। বাংলাদেশের চামড়া খাতে স্বল্প সুদে ঋণের সুবিধা দিতে পারলে আর্থিক সংকটে থাকা চামড়া ব্যবসায়ীরা আবারও নতুন উদ্যোমে ব্যবসা শুরু করতে পারবেন। অর্থনীতির বিশ্লেষকরা একই কথা বলছেন, এ দেশের চামড়া খাতে সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারলে কর্মসংস্থান বাড়বে, যা অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ বা এলডব্লিউজি পরিবেশগত সনদ না পাওয়ায় প্রায় এক দশক ধরে বিশ্ববাজার থেকে প্রায় ছিটকে পড়েছে বাংলাদেশ। একসময় ইতালি, আমেরিকা ও কোরিয়ান ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া নিলেও এখন তারা চীনমুখী হয়েছেন। আর চীনা ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশে আবাসিক অফিস খুলে ট্যানারি থেকে আড়ত পর্যন্ত নিয়মিত দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের একচেটিয়া কারবারে অসহায় অবস্থা এখানকার ব্যবসায়ীদের। এরই মধ্যে গত ২৫ মে কাঁচা চামড়া এবং ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানির অনুমতি দিয়েছে সরকার।
সরকারের এ সিদ্ধান্তের ঘোর বিরোধিতা করেছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এর ফলে চামড়া উৎপাদনে ট্যানারি-মালিকদের ১০ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ ছাড়া পরিবেশদূষণ বাড়বে এবং ফুটওয়্যার ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান লোকসানে পড়বে। কাঁচা চামড়ার অভাবে উৎপাদন বন্ধ থাকলে মেশিনারিজ নষ্ট হয়ে যাবে, মূল্য সংযোজনের পরিমাণ কমে যাবে। চামড়া খাতে মোট রপ্তানি আয় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ কম হবে। ফলে ট্যানারি খাতে নিয়োজিত হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তা বেকার হয়ে পড়বেন।
বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদার গুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ আউয়াল খবরের কাগজকে বলেন, কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি না দিয়ে বরং কাঁচা চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এতে চামড়া খাতে স্থিতিশীলতা আসবে। ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে পশু পালনে সরকারকে আরও মনোযোগী হতে হবে। এতে দেশের গুণগত মানের চামড়ার সরবরাহ বাড়বে, যা চামড়া ব্যবসা সম্প্রসারণে সহায়ক হবে।
চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে উৎপাদন করতে না পারলে রপ্তানি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব পণ্যকে আন্তর্জাতিক ও গুণগত মানোন্নয়ন ও আধুনিকায়ন করা জরুরি। সেই সঙ্গে সংরক্ষণ নিশ্চিতের ওপর জোর দিতে হবে। যার ফলে কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব হবে। বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা সহজ হবে। প্রত্যাশা করছি, সরকার এ শিল্পকে বাঁচাতে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে।