মহাকালের অতল গর্ভে বিলীন হয়ে গেল আরও একটি বছর। বিদায় খ্রিষ্টীয় সাল ২০২৩। হিসাব-নিকাশ করলে দেখা যাবে বিগত বছরে আমাদের জাতীয় জীবনে অর্জন সাফল্যের দ্যুতি যেমন রয়েছে, তেমনি অপ্রাপ্তিও কিছু আছে। স্বপ্ন সম্ভাবনা, প্রত্যয় অগ্রগতির ইতিবাচক ধারায় মানুষ নিয়ত উদ্দীপিত ও সংগ্রামশীল। নানামুখী সংকট সমস্যা মোকাবিলায় আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়াই মানবধর্ম। সভ্যতার ইতিহাস সে কথাই বলে। বাধাবিঘ্ন প্রতিকূলতা ছিল, আছে এবং থাকবেই। তার মধ্যেই উজান ঠেলে এগিয়ে যেতে হবে।
করোনা-পরবর্তী বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা কাটিয়ে বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিগত বছরে। অনেকটাই এগোনো সম্ভবপর হয়ে উঠেছে অর্থনৈতিক স্বয়ম্ভরতার দিকে। রিজার্ভ আশঙ্কাজনক পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল। ডলারসংকটও বেশ ভুগিয়েছে। সেই সব প্রতিকূলতা কাটিয়ে স্বাভাবিক ধারায় ফিরে আসার জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস ছিল লক্ষণীয়। এ ক্ষেত্রে আংশিক সাফল্য ইতোমধ্যে প্রতীয়মান হয়েছে। করোনার ধকল কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই ডেঙ্গুর করালগ্রাসে হারাতে হয়েছে অনেক অমূল্য জীবন। মানুষের মধ্যে স্বাস্থ্যসচেতনতা বেড়েছে আগের তুলনায়। বৃদ্ধি পেয়েছে গড় আয়ু। তা সত্ত্বেও স্বাস্থ্যবিষয়ক কোনো কোনো খাতে বিপর্যয় এড়ানো যায়নি। এগুলো শিক্ষণীয় অধ্যায় হিসেবে রয়ে গেল। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এলে অতীত অভিজ্ঞতা কাজে লাগবে।
গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির চর্চা ও বিকাশে প্রতিবন্ধকতা, পরমতসহিষ্ণুতার ঘাটতি, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সংঘাত, সহিংসতার বিস্তার আমরা বেদনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ করেছি। রাজনীতির ক্ষেত্রে পারস্পরিক অবিশ্বাস, সংশয় ও বিভক্তি কখনোই সুফল বয়ে আনে না। জাতীয় জীবনের সমৃদ্ধি, প্রগতি, উন্নয়ন, স্থিতিশীলতার সবই অর্জন করতে হবে দেশবাসীর সম্মিলিত প্রয়াসে। এসব কোনো একক দল বা সরকারের একক প্রচেষ্টায় অর্জন করা সম্ভবপর নয়। অনৈক্য, বিভেদ, অবিশ্বাস কখনো কিছু অর্জনে সহায়ক হয় না। এই বোধ ও উপলব্ধি যত দ্রুত এবং যত গভীরভাবে আমাদের মধ্যে সঞ্চালিত হবে, সামগ্রিক অর্থনৈতিক মুক্তির পথ ততই সুগম হয়ে উঠবে।
বর্তমান সরকারের মেয়াদ পূর্তির বছর ছিল বিদায়ী ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দ। সারা বছরই টালমাটাল থেকেছে রাজনৈতিক অঙ্গন। ছিল অস্থিরতা, টানাপোড়েন। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র রাষ্ট্র হলেও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে এ দেশের ওপর বৃহৎ শক্তিগুলোর নজর ও নজরদারি প্রকট হওয়ার প্রবণতা দৃশ্যমান। রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি সব ক্ষেত্রেই নিয়ন্তা ও নিয়ামক হচ্ছেন দেশের জনগণ। সেটাই দস্তুর, নৈতিকতার দৃষ্টিকোণ থেকেও সেটাই হওয়া উচিত। কিন্তু আমরা কী দেখেছি বা দেখছি? বহিঃশক্তির নাক গলানো কোনোভাবেই অভিপ্রেত নয়। কূটনীতিক মহল আসন্ন নির্বাচন যাতে অবাধ, নিরপেক্ষ, অংশগ্রহণমূলক এবং গ্রহণযোগ্য হয়, সেসব বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছে। এ নিয়ে কূটনীতিকদের বেশ দৌড়ঝাঁপ ছিল। বাংলাদেশ সরকার সাফ বলে দিয়েছে, আমাদের ভাগ্য আমরাই নির্ধারণ করব।
রাজনীতির ক্ষেত্রে অনিশ্চয়তার কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য সমঝোতা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি গুরত্বের সঙ্গে উপলব্ধ হয়। কিন্তু তার কোনো বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। ফলে বিরোধী দলের আন্দোলন সহিংস হয়ে উঠেছে। তবে এটাও ঠিক, ক্ষমতাসীনদের তরফে দায়িত্বশীলতা ও ছাড় দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যক্ষ করা যায়নি। বিবদমান দুই পক্ষের এই অনৈক্য ও দূরত্ব শেষ অবধি দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না।
চলমান মেগা প্রকল্পগুলোতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের কাজ এগিয়ে চলেছে। স্বপ্নের একটি প্রকল্প কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত বঙ্গবন্ধু টানেলের উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পদ্মা সেতু দিয়ে ট্রেন যোগাযোগ চালু হয়েছে। রাজধানী ঢাকায় ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়েছে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে। মেট্রোরেলের সব স্টেশনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়েছে। বেড়েছে মাথাপিছু আয়। উন্নয়নের সুফল ভোগ করছেন জনগণ।
ক্রীড়াঙ্গনে বিশ্বকাপ ক্রিকেটে ব্যর্থতা বিপর্যয় ঘটলেও সামগ্রিক বিচারে অগ্রগতি হয়েছে। নারী ফুটবলাররা দেশের জন্য সম্মান বয়ে এনেছেন। পোশাকশিল্প খাতে বিশৃঙ্খলা, শ্রমিক আন্দোলন ছিল মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে। ঘটেছে প্রাণহানির মতো দুঃখজনক ঘটনাও। শ্রমিকদের দাবি পূরণ করা হয়েছে। বাংলাদেশের পোশাকশিল্প খাত বিদেশি কোনো চক্রান্তের শিকার, তারই জেরে এসব অস্থিরতা, এমন পর্যবেক্ষণও উঠে এসেছে। বিশ্বে শোচনীয় পর্যায়ের বায়ুদূষণকবলিত শহরের তালিকায় আমাদের রাজধানী ঢাকা সংবাদ শিরোনামে ছিল প্রায়শই। এই দিকটায় অগ্রগতি আমরা নিশ্চিত করতে পারিনি।
আমাদের প্রত্যাশা সুন্দর, শান্তিপূর্ণ আগামী। ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলের চেয়ে দেশ ও দেশের স্বার্থ অনেক বড়। সাধারণ মানুষ শান্তি স্বস্তি চায়। তাদের এই চাওয়াও খুবই সাধারণ, দুবেলা দুমুঠো খাওয়ার নিশ্চয়তা। দেশের শান্তি স্থিতিশীলতাই সবার মূল কাম্য। হানাহানি বিদ্বেষ প্রতিহিংসা সংঘাত মানুষের পছন্দ নয়। দুই তরফে আরও সহনশীলতার বহিঃপ্রকাশ দেশবাসী দেখতে চান। সমাগত নতুন খ্রিষ্টীয় নববর্ষ সেই প্রত্যাশার আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক। সবাইকে নতুন বছরের প্রীতি ও শুভেচ্ছা।