বাংলাদেশের বস্ত্র খাত প্রথম রপ্তানি আয় করে আশির দশকের প্রারম্ভে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে রূপকল্প-২০৪১ বাস্তবায়নে পাট ও বস্ত্র খাতে নতুন নতুন উদ্ভাবন কাজে লাগিয়ে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, দক্ষ মানবসম্পদ, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং রপ্তানি বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়ার সময় এসেছে। একসময় পাটের ঐতিহ্য ছিল। এ দেশের প্রধান রপ্তানিপণ্য ছিল। সেই ঐতিহ্যবাহী পণ্যকে আমরা হারাতে চাই না, টেকসই উন্নয়নের যুগে বিশ্বব্যাপী পরিবেশবান্ধব পাট ও পাটপণ্যের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। পাটপণ্য একটি পরিবেশবান্ধব পণ্য। তাই রপ্তানি বাড়াতে এই পণ্যের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতেও বস্ত্র খাতের রয়েছে অনেক ভূমিকা। দেশের অর্থনীতিতে বস্ত্র খাত প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত। দেশের অর্থনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ বস্ত্র খাত। এ শিল্পের ইতিহাস সুপ্রাচীন ও গৌরবময়। বর্তমানে তৈরি পোশাকশিল্পে উন্নত মানের ২০৬টি সবুজ কারখানা (গ্রিন ফ্যাক্টরি) নিয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় বস্ত্র দিবস পালিত হয়েছে। দিবসটি পালনের মাধ্যমে বস্ত্র খাতের উন্নয়নে মনোযোগী হবে কর্তৃপক্ষ।
যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্গঠনে পোশাক রপ্তানি থেকে যে আয় ছিল তা বিরান মরুভূমিতে এক পশলা বৃষ্টির মতো আশাজাগানিয়া। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পর ২০২৪ সালে সেই পোশাকশিল্প এখন বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। রপ্তানি আয়ে এ শিল্পের শেয়ার ৮৫ শতাংশ। বছরে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ৫ লাখ কোটি টাকা। রপ্তানি আয়ে সাফল্যের এই দীর্ঘ পথ মসৃণ ছিল না। অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এ দেশটির পোশাকশিল্প আজ বৈশ্বিক পোশাক বাজারে দ্বিতীয় শীর্ষ অবস্থানে। বিশ্লেষকরা বলে থাকেন, এটি অর্থনীতি বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদ ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্প্রতি তার এক বক্তব্যে পোশাক খাতের মূল্যায়ন করেছেন এই বলে যে, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও বংশপরম্পরায় ধনিক শ্রেণির বাইরে প্রথমবারের মতো সাধারণ শিল্পোদ্যোক্তারা বিত্তশালী হতে শুরু করে পোশাকশিল্পের রপ্তানি আয় দিয়ে। আর এ শিল্পের আয় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় মাধ্যম হয়ে দাঁড়ায়। অর্থনীতিতে এর বহুমুখী ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি হয়। সহায়ক শিল্পকারখানা প্রতিষ্ঠিত হয়, কর্মসংস্থান বাড়ে।
এ শিল্প বিকাশের সঙ্গে আর্থিক খাত, প্রিন্টিং ও প্যাকেজিংসহ বেশ কিছু সহযোগী শিল্প খাত তৈরি হয়েছে। বিস্তৃত হয়েছে আবাসন খাতও। এসব খাতে একটি উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মসংস্থান হয়েছে। এ শিল্প এখন গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জ্বালানিসংকটে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে। প্রায় ৫ মিলিয়ন শ্রমিক এ শিল্পের শক্তি। নিট ও ওভেন কারখানা মিলিয়ে রয়েছে ৭ হাজারের মতো উদ্যোক্তা। তবে মোট রপ্তানি আয়ের পুরোটা পায় না বাংলাদেশ। কারণ কম্পোজিট কারখানা ও কাঁচামালের ঘাটতি রয়েছে। ফলে ওভেনে কাঁচামাল ও নকশা বা ডিজাইন ক্রয় বাবদ ৬০ শতাংশ বিদেশে চলে যায়। আর নিটিংয়ে ব্যয়ের পরিমাণ ৪০ শতাংশ। অর্থাৎ মোট রপ্তানি আয়ের অর্ধেকের মতো চলে যায় বিদেশে। বিজিএমইএর সভাপতি ফারুক হাসান খবরের কাগজকে বলেন, বিশ্বের শীর্ষ ১০০টি উচ্চমানের পোশাক কারখানার মধ্যে বাংলাদেশেরই ৫৪টি। এ ছাড়া বিশ্বের শীর্ষ ১০টি কমপ্লায়েন্ট ও বেস্ট রেটেড পোশাক কারখানার ৯টি বাংলাদেশের। ইউএসজিবিসির লিড বা এলইডি সার্টিফায়েড বিশ্বের শীর্ষ ২০টি পোশাক কারখানার ১৮টি বাংলাদেশে। তিনি বলেন, এটিও আমাদের জন্য গর্ব ও আনন্দের। আমাদের শিল্প আজ বিশ্বনন্দিত।
তৈরি পোশাকের পণ্যগুলোর গুণগত মান বাড়ানো প্রয়োজন। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি হবে এবং বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারবে। তৈরি পোশাকশিল্পের রপ্তানিতে নতুন বাজারের সন্ধান করতে হবে। একটি সম্ভাবনাময় খাতকে আরও গতিশীল করতে গবেষণার পরিধিও বাড়াতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই সময়ে প্রযুক্তির সঙ্গে আত্মস্থতা বাড়িয়ে শিল্পের উদ্যোক্তা ও কর্মী- এ দুই পর্যায়েই দক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। রপ্তানিপণ্য হিসেবে শুধু গার্মেন্টপণ্যের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বহুমুখী পাটজাত পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। রপ্তানি বাড়াতে সরকার বস্ত্র খাতের অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বয় করে এ খাতের আধুনিকায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখবে, সেটাই প্রত্যাশা।