যানজটে নগরবাসীর জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। যানজটের কবলে পড়ে মানুষের কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি কমছে। আর এতে জাতীয় অর্থনীতির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ যানজট। এ ছাড়া যানজটে প্রতিনিয়ত মানসিক চাপ নিয়েই চলাচল করতে হচ্ছে। যানজটের কারণে ট্রাফিকব্যবস্থা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। সড়কে সিগন্যাল বাতি অকার্যকর রয়েছে অনেক আগে থেকেই। উল্টো পথে যানবাহন চলাচল, ফুটপাতে মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের চলাচল থেমে নেই। আইনের তোয়াক্কা করছেন না কেউ। পথচারীরাও বেপরোয়া। ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও তা ব্যবহার করছেন না অনেকেই। রাজধানীর এমন চিত্র প্রতিদিনের।
যানজট এড়াতে ফুটওভার ব্রিজ, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেলসহ সড়ক যোগাযোগে ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়েছে, কিন্তু যানজট নিরসন হয়নি। সকালে কর্মস্থলে যেতে মানুষের ব্যস্ততা বেশি থাকে। একই সময়ে শিক্ষার্থীরাও স্কুল-কলেজে যাতায়াত করে। এ সময়ে যানবাহন চলাচলের ধীরগতির কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় নগরবাসীকে।
এ প্রসঙ্গে বুয়েটের অধ্যাপক এম শামসুল হক বলেন, যানজট বেড়ে যাওয়ার কারণ গাফিলতি। সারা বছর যানজট নিরসনে কাজ করা হয় না। শুধু যখন রমজান আসে, তখন তৎপর হয় কর্তৃপক্ষ। সেগুলোও আবার লোক দেখানো, অভিযানসর্বস্ব। সারা বছরই যদি ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাটা নিয়ন্ত্রণ করা যেত, রিকশা নিয়ন্ত্রণ করা যেত, ফুটপাত পথচারীবান্ধব করা যেত, তাহলে জনগণ এর সুফল পেত। কিন্তু অভিযানসর্বস্ব কাজ করার সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে পরিস্থিতি খারাপ হতেই থাকবে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্যমতে, ঢাকার রাস্তায় চলাচলকারী নিবন্ধিত বাসের সংখ্যা ৪১ হাজার ৫৮৫টি, মিনিবাসের সংখ্যা ১০ হাজার ১৫৮টি, নিবন্ধিত অটোরিকশা ২০ হাজার ৮৭৯টি, মাইক্রোবাস ৯৬ হাজার ২৬৬টি চলছে। এ ছাড়া ঢাকার সড়কে বিআরটিএর নিবন্ধন পাওয়া প্রাইভেট কার ৩ লাখ ৪০ হাজার ৩৬৪টি। সব মিলিয়ে ঢাকার সড়কে চলাচলকারী বৈধ পরিবহনের সংখ্যা ২০ লাখ ৯৩ হাজার।
ফুটপাত দখলমুক্ত না হওয়া ঢাকার যানজট সৃষ্টির বড় কারণ বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। এমন একটা শহরে যেখানে প্রায় ২ হাজার ৬০০ কিলোমিটার ফুটপাত দরকার, কিন্তু আছে মাত্র ৫১৫ কিলোমিটার। এই ফুটপাতও অমসৃণ, আঁকাবাঁকা বা অনাবৃত ড্রেন এবং ম্যানহোলের সমন্বয়ে গঠিত। দখলদাররা ফুটপাত দখল করে হকারদের ভাড়া দিয়েছেন।
নিরাপদ সড়ক চাই-এর সভাপতি ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, শহরে যানজট নিরসনের জন্য মেট্রোরেল চালু করা হয়েছে। কিন্তু মেট্রোরেলের সুবিধা ভোগ করছেন যাদের বাসা বা অফিস মেট্রোরেল রুটের কাছাকাছি আছে তারা। ঢাকার যানজট নিরসনের জন্য মেট্রোরেলের পরিকল্পনা করতে হবে মাকড়সার জালের মতো। যেন নগরীর সবাই এর সুবিধা পায়।
সড়কে ফিটনেসবিহীন যেসব গাড়ি চলছে, তা বন্ধ করার কোনো উদ্যেগ নেই। সরকার পরিবহন সেক্টরের নেতাদের কথা বেশি শোনে। সরকার গণপরিবহন নিয়ন্ত্রণে আইন করেছে কিন্তু তা বাস্তবায়ন করে না। এ বিষয়ে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের (ডিটিসিএ) নির্বাহী পরিচালক সাবিহা পারভীন বলেন, ঢাকার নগর পরিবহনের সমন্বয় করতে হলে কিছু নীতি পরিবর্তন করতে হবে। ঢাকায় যে পরিমাণ রাস্তা আছে, যে পরিমাণ গণপরিবহন আছে, সেগুলো থেকেই জনগণকে সুবিধা পাইয়ে দিতে হবে। শহরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার কোনো উন্নতিই পরিলক্ষিত হচ্ছে না। কেউ ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করলে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।
প্রয়োজনে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ট্রাফিক আইন ভঙ্গের কারণে কোনো গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা করলে মানুষ আইন মানতে বাধ্য হবে। অথচ এ কাজে এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পেছনে জনগণের অর্থ ব্যয় হলেও জনগণ কোনো সুফল পাচ্ছে না। নগরবাসীকে যানজটের এই মহাদুর্ভোগ থেকে স্বস্তি দিতে সবার আগে জরুরি প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বিকেন্দ্রীকরণ। এ ছাড়া গণপরিবহনকে শৃঙ্খলায় আনা অতি জরুরি। নতুন বাস রুট চালুর পরিকল্পনা করতে হবে। কিন্তু তার আগে সড়ক যানজটমুক্ত করতে হবে, যানবাহনগুলোয় যাত্রীরা যেন নির্বিঘ্নে চলতে পারে তার বন্দোবস্ত করতে হবে।