মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ৩১ মে ২০২৪ থেকে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিনভর অপেক্ষা শেষে গত শুক্রবার যেতে না পারায় হাজারও কর্মী কান্নাকাটি করেছেন। অতিরিক্ত টাকা দিয়েও মেলেনি তাদের ফ্লাইটের টিকিট। সংকট জেনেও জোরালো পদক্ষেপ নেয়নি মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে অভিযোগ উঠেছে, আবারও টিকিটের দাম কয়েক গুণ বাড়িয়েছে সিন্ডিকেট। বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, দীর্ঘ চার বছর বন্ধ থাকার পর ২০২২ সালে শ্রমবাজার চালু করা হয়। এরপর মালয়েশিয়া থেকে পাওয়া চাহিদাপত্রের বিপরীতে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ৫ লাখ ২৪ হাজার ৯৪৬ কর্মীকে মালয়েশিয়া যাওয়ার অনুমোদন দেয়।
গত মার্চে মালয় সরকার ঘোষণা করেছিল, দেশটির ভিসা পাওয়া বিদেশি কর্মীদের ৩১ মের মধ্যে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করতে হবে। প্রায় আড়াই মাস সময় পাওয়ার পরও ভিসা পাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত ফ্লাইট নিশ্চিত করতে পারেনি সরকার। ফ্লাইট বৃদ্ধির ব্যবস্থা না করে মন্ত্রণালয় কর্মীদের প্রবেশের সময়সীমা বৃদ্ধির অনুরোধ করে। এতে সাড়া না দিয়ে ৩১ মে সব দেশের কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে মালয়েশিয়া। শ্রমবাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়া সরকার নতুন কোটা বরাদ্দ করে বাংলাদেশসহ সব ‘সোর্স কান্ট্রি’ থেকে আবার কর্মী নেওয়া শুরু করবে ২০২৪ সালের দ্বিতীয়ার্ধে।
মালয়েশিয়া এ ধরনের নিয়ম করায় হাজারও কর্মীর সর্বনাশ হয়েছে। অনেকে বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সি ও দালালকে টাকা দিয়েও শেষরক্ষা পাননি। যেতে পারেননি তাদের স্বপ্নের দেশে। এদিকে কর্মীদের টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়েছেন প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং রিক্রুটিং এজেন্সির সংগঠন বায়রার নেতারা। জনশক্তি ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ২০২২ সালের ৮ আগস্ট থেকে গত শুক্রবার পর্যন্ত ৪ লাখ ৭০ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া গেছেন। ছাড়পত্র পেয়েও ২৩ হাজারের বেশি কর্মী নানা কারণে দেশটিতে যাননি। টিকিট সংকটে যেতে না পারা কর্মীর সংখ্যা ১০ হাজার হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মালয়েশিয়ান সরকার তাদের সিদ্ধান্তে অনড়। বায়রা দাবি করছে, এজেন্সির পক্ষ থেকে সবকিছু করা হলেও সরকারি ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ছিল। তারা বলছে, মালয়েশিয়া গমনেচ্ছুদের জন্য বাড়তি ফ্লাইট পরিচালনা করা হলে বর্তমানে এ সমস্যা তৈরি হতো না। টিকিটবিহীন পাঁচ থেকে ছয় হাজার কর্মী বিক্ষোভ করেছেন শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। শুক্রবার বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে তাদের সামাল দিতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে।
বেশ কয়েকটি ট্রাভেল এজেন্সির নেতৃত্বে বিশেষ সিন্ডিকেট শ্রমিকদের জিম্মি করে রাতারাতি হাতিয়ে নিয়েছে শতকোটি টাকারও বেশি। এমনই অভিযোগ উঠে এসেছে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার কালো তালিকাভুক্ত করেছে ৫৩টি এজেন্সিকে। অন্যদিকে ৪৭টি এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে মালয়েশিয়া। জানা গেছে, প্রায় ১০ লাখ কর্মীর মেডিকেল করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো। দেশটিতে প্রবেশের সময় বৃদ্ধি না হলে প্রায় ২০ থেকে ৩০ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া গমনে অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
মালয়েশিয়া অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। আটকে পড়া বাংলাদেশি কর্মীরা ঋণের চাপে আধুনিক দাসত্বের কবলে পড়বে বলে সতর্ক করে ফিনল্যান্ডভিত্তিক অধিকার সংগঠন ফিনওয়াচ। তাই মালয়েশিয়া সরকারকে বিষয়টি বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। ফিনওয়াচের গবেষক অ্যান্ডি হল বলেছেন, মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য শ্রমিকরা ধার করে এজেন্টদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়েছেন। এখন তারা মালয়েশিয়া আসতে না পারলে চরম বিপদে পড়বেন। তারা তীব্র ঋণের চাপে আধুনিক দাসত্বের শিকার হবেন।
বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। মালয়েশিয়া সরকারের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য হতাশার বিষয়। এতে বিদেশে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় ধরনের ধাক্কা খেল। শুধু মালয়েশিয়ায় নয়, বাংলাদেশিরা এখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছেয়ে আছে। এতে সরকারও বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স পেয়ে থাকে। সম্প্রতি অবৈধভাবে ভূমধ্যসাগর দিয়ে ইউরোপে বাংলাদেশিরা বেশি যাচ্ছে। এ পথে যাওয়া সব দেশ থেকে শীর্ষে রয়েছে বাংলাদেশ। এ প্রবণতা পরিহার করে বৈধপথে প্রশিক্ষণ দিয়ে বিদেশে কর্মী পাঠালে দেশ লাভবান হবে।
রেমিট্যান্সযোদ্ধারা দেশের মায়া ত্যাগ করে বিদেশের মাটিতে শ্রম বিনিয়োগ করে অর্থ পাঠাচ্ছেন। তারা দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। এদিকে অবশ্যই সংশ্লিষ্টদের মনোযোগী হতে হবে। বাংলাদেশের যেসব কর্মী মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি তাদের দ্রুত পাঠাতে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। ভবিষ্যতে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত হলে যাতে কোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মী নিয়োগ না করা হয়, সে জন্য উভয় দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে শক্ত অবস্থান নিতে হবে। জনশক্তি রপ্তানিতে শৃঙ্খলা ফিরে আসুক, সেটাই প্রত্যাশা।