ইচ্ছা থাকলে উপায় হবেই। বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর দুই দেশ, অঞ্চল, এশিয়া ও বিশ্বকে এগিয়ে নেবে। বাংলাদেশকে রেল রোডে বৃহত্তর সংযোগ দিয়ে শিল্প-বাণিজ্যে অকল্পনীয় অগ্রগতি দেবে। চীনের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধি করবে। মানুষের অভাব পূরণ ও দারিদ্র্যবিমোচনে দ্রুত এগিয়ে যাবে দেশ।...

দীর্ঘ দৃষ্টিতে লক্ষ্য করে দেখেছি রেল যোগাযোগ যাতায়াত সেবা দিলেও সেবার মান আঞ্চলিক ও বিশ্বমানের নয়। ১৮৬২ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাংলাদেশের মাটিতে দর্শনা-কুষ্টিয়া-গোয়ালন্দে প্রথম যে রেলপথ বানিয়েছিল তা আজ আরও উন্নত হওয়ার কথা। জগতি আজ বিরানভূমি প্রায়। অথচ এটাই বাংলাদেশের প্রথম রেলস্টেশন। একে বহুমুখী করা জরুরি।
বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর বাংলাদেশ তথা গোটা অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য জরুরি। কক্সবাজার-কুনমিং রেল রোড হলে বাংলাদেশকে সমগ্র এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সংযোগ করবে। শুধু তাই নয়, এর প্রতিটি স্টেশনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে আরও গতিশীল, আরও উৎপাদনশীল সমাজ। মাত্র দুই দশকের মধ্যে চীন বিশ্বের বৃহত্তম হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যা বর্তমানে পৃথিবীর বাকি সব দেশের সম্মিলিত নেটওয়ার্কের চেয়েও বড়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে চীনের প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা তীব্র যানজট এবং ধীরগতির সমস্যায় জর্জরিত ছিল। দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে চীনে রেলের আধুনিকায়ন জরুরি হয়ে পড়। ২০০৪ থেকে ২০১৪, এ সময়ে চীন ১০ হাজার কিলোমিটার রেলপথ বানায়, যার গতি ২০০ কিলোমিটারের অধিক। চীনের রেলপথ গড়ার এ কাজকে বলে রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন ওয়্যার বা রেল গড়ার যুদ্ধ। ঘণ্টায় ২০০ কিলোমিটার বা তার চেয়ে বেশি গতির রেলকে উচ্চ গতি বা হাইস্পিড রেল বলা হয়। জাপান ১৯৬৪ সালে প্রথম ২১০ কিলোমিটার গতির রেল গড়ে তোলে, যাকে সিনকানসেন বা বুলেট ট্রেন বলা হয়।
প্রশ্ন হলো, একটি বিশ্বমানের রেল গঠন, সেবাদান, যাত্রী তৈরি, শিল্পায়ন ব্যতীত বাংলাদেশ আর কতদিন অপেক্ষা কববে? এখানে বাংলাদেশ ও চীনের মেলবন্ধন দরকার। বাংলাদেশ পৃথিবীর সপ্তম বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ। বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী পৃথিবীর চতুর্থ বৃহত্তম। আছে পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। উত্তরে হিমালয়, দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু আজকের বাংলাদেশ। মাটি, মানুষ, পানি, ভূপ্রকৃতি, খনিজ–সব মিলিয়ে বিপুল সম্ভাবনার ভূকেন্দ্র। সত্যি বলতে, বাংলাদেশ গঠনে যুদ্ধের তেজ দরকার। রেল দেখার লোভ আজন্ম। আমি একবার ঢালারচর গিয়েছিলাম। শুনেছি ঈশ্বরদী থেকে ঢালারচর রেললাইন হয়েছে। কিন্তু অবাক হয়ে লক্ষ করলাম, স্টেশনে ঢোকার রাস্তা সংকীর্ণ। রেলস্টেশনে যাওয়ার রাস্তা সুগম হতে হবে। ঈশ্বরদী জংশন দেখে বিস্মিত হতাম সেই শৈশব থেকে।
মানুষ ও মালামাল পরিবহনের জন্য রেল। সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ হলো রেল। রেল-নীতিপদ্ধতি পরিকল্পনা তৈরি বিশাল কাজ। সে কাজের দক্ষতা, যোগ্যতা দু-এক দিনে হয় না। আমাদের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে রেলপাঠের সিলেবাস ছোট। নেই কোনো রেল বিশ্ববিদ্যালয়। নেই তেমন গবেষণা প্রতিষ্ঠান। মিডিয়ায় প্রচারও কম। রেলভবনে বড় একটি লাইব্রেরি থাকতে পারত। বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর নয় শুধু। দরকার বাংলাদেশ-চীন একাডেমি অব রেলওয়ে সায়েন্স অ্যান্ড গভর্নেন্স।
বাংলাদেশ রেলওয়েকে আঞ্চলিক ও বিশ্বমানের করতে করণীয়: ১. বাংলাদেশ-চীন রেল করিডর, ২. বাংলাদেশ-চীন রেল বিশ্ববিদ্যালয়, ৩. বাংলাদেশ-চীন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট একাডেমি অব রেলওয়ে সায়েন্স অ্যান্ড গভর্নেন্স, ৪. রোহনপুর-সান্তাহার-বগুড়া-কালীতলা ঘাট রেল, ৫. কালীতলা সারিয়াকান্দী নৌবন্দর, ৬. জগতি রেলস্টেশন বিশ্বমানের করা, ৭. কুষ্টিয়া কোর্ট ও বড় স্টেশনকে মাটির নিচ দিয়ে স্টেশনকে বহুমুখী করা, ৮. দৌলতদিয়া-নগরবাড়ী-আরিচায় নতুন নগরায়ণ ও ত্রিমুখী রেল ব্রিজ বা টানেল করা, ৯. মানিকগঞ্জ-নারায়ণগঞ্জ-কুমিল্লা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-কুনমিং হাইস্পিড রেল, ১০. খুলনা-বরিশাল-ভোলা-লক্ষ্মীপুর রেল, ১১. বরিশাল-কুয়াকাটা রেল, ১২. বগুড়া-জামালপুর রেল ও সারিয়াকান্দী রেল টানেল, ১৩. দেশের সব জেলায় রেল সংযোগ, ১৪. ঢাকা সার্কুলার রেল-নৌ-রোড, ১৫. আমাদের রেল কারখানাগুলো আরও উৎপাদনমুখী করা। আমরা কেন রেল ইঞ্জিন ও ওয়াগন বানাব না। আর তা না পারলে আমরা ভারী শিল্পে এগিয়ে যেতে পারব না। ইচ্ছা থাকলে উপায় হবেই। চুরির নিয়ত ত্যাগ করতে হবে। ইন্দোনেশিয়া ইরান কোরিয়া জাপান জার্মানি পারলে বাংলাদেশকে পারতেই হবে। ব্রিটিশের গড়া সৈয়দপুর রেল কাখানাকে কীভাবে তিলে তিলে পিছিয়ে দিয়েছি আমরা, তা দেখেছি।
যাদের জন্য রেল তারা কেমন হবেন? উদ্যোগী, উৎপাদনশীল, পরিশ্রমী, মানবপ্রেম-দেশপ্রমী, প্রশিক্ষিত, মেধাবী। লাখ লাখ মানুষ রিকশা-অটোরিকশা চালিয়ে জীবনযুদ্ধে লিপ্ত। নগর-বন্দর, হাটবাজার সর্বত্র তারা ছড়িয়ে। তাদের সঙ্গে তাদের জীবনসঙ্গী, সন্তান ও তাদের মা-বাবা তথা নির্ভরশীলরা। আর তার জন্য দরকার দক্ষ, যোগ্য ও শক্তিশালী মানুষ গড়ার শিক্ষা।
পরিশেষে বলব, বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্যিক করিডর দুই দেশ, অঞ্চল, এশিয়া ও বিশ্বকে এগিয়ে নেবে। বাংলাদেশকে রেল রোডে বৃহত্তর সংযোগ দিয়ে শিল্প-বাণিজ্যে অকল্পনীয় অগ্রগতি দেবে। চীনের শক্তি-সামর্থ্য বৃদ্ধি করবে। মানুষের অভাব পূরণ ও দারিদ্র্যবিমোচনে দ্রুত এগিয়ে যাবে দেশ।
লেখক: কর কমিশনার, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড